নাটোরের সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি বেডই এখন প্রায় ৭৫ বছর বয়সী আব্দুল মজিদের ঠিকানা। স্বজন বলতে কেউ নেই, নেই স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মাও নেই। অসুস্থ শরীর নিয়ে বছরের পর বছর ধরে এই হাসপাতালেই কাটছে তার দিন-রাত। কখনো ভর্তি রোগীদের দেওয়া খাবার, কখনো নার্সদের মমতাই হয়ে উঠেছে তার বেঁচে থাকার অবলম্বন।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালের একটি বেডে শুয়ে আছেন বৃদ্ধ আব্দুল মজিদ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছে শরীর। ঠিকমতো দাঁড়াতে কিংবা হাঁটতেও পারেন না। হাসপাতালের বেডটি তার কাছে এখন শুধু চিকিৎসার স্থান নয়, যেন ঘরবাড়িও।
আব্দুল মজিদ সিংড়া পৌর শহরের হাসপুকুরিয়া গ্রামের মৃত মেসের আলী সরদারের ছেলে। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। কয়েক বছর পর মারা যান তার মা। প্রায় ২৫ বছর বয়সে নুরজাহান বেগমকে বিয়ে করেন মজিদ। তবে অভাব-অনটনের সংসারে দেড় বছর পরই স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে যান। এরপর আর সংসার করা হয়নি। সন্তানও নেই তার।
জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টাও করেছিলেন মজিদ। সিংড়া দমদমা স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ১৯৭৫ সালে এসএসসি এবং ১৯৭৭ সালে এইচএসসি পাস করেন। পরে নাটোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ কার্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক চাকরি করেন। তিন বছর মেয়াদ শেষে সেই চাকরিও চলে যায়। এরপর ধীরে ধীরে আরও কঠিন হয়ে ওঠে তার জীবন। স্বজন হারানোর পাশাপাশি হারিয়েছেন নিজের বসতভিটাটুকুও।
আব্দুল মজিদ বলেন, “আমার যতটুকু বসতভিটা ছিল, মামারা সেটাও লিখে নিয়েছে। এখন আর কেউ আমার খোঁজ নেয় না। হাসপাতালই এখন আমার ঠিকানা।”
হাসপাতালের চিকিৎসক ও নার্সদের সেবার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা তাকে যথেষ্ট সেবা দেন এবং নিয়মিত খোঁজখবর রাখেন।
নিজের দেখাশোনার মতো কেউ না থাকায় অসুস্থ হলেই সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চলে আসেন মজিদ। একবার-দুবার নয়, বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালেই কাটছে তার জীবন। হাসপাতালের একটি বেডের পাশে তার ব্যক্তিগত ফ্যান, কাঁথা, কম্বল, বালিশসহ প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস রয়েছে। শ্বাসকষ্টের সময় ব্যবহারের জন্য রয়েছে নেবুলাইজার মেশিনও।
হাসপাতালে ভর্তি রোগীরাও এখন তার পরিচিত মানুষ। কেউ তার সঙ্গে কথা বলেন, কেউ খোঁজ নেন, আবার কেউ নিজের খাবার থেকেও ভাগ দেন। হাসপাতালের নার্সদের কাছেও মজিদ হয়ে উঠেছেন পরিবারের একজনের মতো।
সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নার্সিং সুপারভাইজার সখিনা খাতুন ও নার্স শরফুন্নেসা বলেন, মজিদ দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালে থাকেন। তারা নিজেদের সাধ্যমতো তার খোঁজখবর ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
তারা বলেন, “উনি অনেক বৃদ্ধ মানুষ। হাঁটতেও পারেন না। রাউন্ডে গেলে বলেন, ছোট মাছ বা অন্য কোনো তরকারি হলে তৃপ্তি করে ভাত খেতে পারতেন। তাই মাঝে মাঝে আমরা বাড়ি থেকে তার জন্য খাবার নিয়ে আসি। এতে আমাদেরও ভালো লাগে।”
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মুজাহিদুল ইসলাম খোকন বলেন, মজিদ বছরের প্রায় ১১ মাস অসুস্থ থাকেন। তাকে দেখাশোনার মতো কেউ না থাকায় তিনি প্রায় সারা বছরই হাসপাতালে থাকেন। বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে এবং কর্তৃপক্ষও বিষয়টি অবগত রয়েছে।
সিংড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক কর্মকর্তা ডা. জহুরুল ইসলাম বলেন, মজিদের নিয়মিত খোঁজখবর রাখা হয়। তার প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা বিনামূল্যে করা হয়। বয়সের কারণে তার পুরোপুরি সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা কম। আগে তিনি প্রতি মাসে হাসপাতালে ভর্তি হতেন। গত দেড় বছর ধরে তিনি স্থায়ীভাবে হাসপাতালে অবস্থান করছেন। থাকার মতো অন্য কোনো জায়গা না থাকায় মানবিক দিক বিবেচনা করে তাকে হাসপাতালে রাখা হচ্ছে।
সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল রিফাত বলেন, আব্দুল মজিদ চাইলে সরকারি সহায়তায় তার স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তার বিষয়টি মানবিকভাবে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই শেষে সরকারি ব্যবস্থায় তার জন্য বসবাসের সুযোগ বা উপযুক্ত সহায়তার ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আব্দুল মজিদের চাওয়া খুব বেশি নয়—একটু আশ্রয়, দুবেলা খাবার আর আপনজনের মতো কিছুটা মমতা। একসময় পড়াশোনা করেছেন, চাকরি করেছেন, সংসার করার স্বপ্ন দেখেছেন। অথচ আজ নিজের বলতে একটি ঘরও নেই।
বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার ইচ্ছা নেই মজিদের। হাসপাতালকেই তিনি নিজের শেষ ঠিকানা হিসেবে মেনে নিয়েছেন। জীবনের শেষ নিঃশ্বাসটুকুও যেন এই হাসপাতালেই কাটাতে চান তিনি।
এই বাংলা/এমএস