রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

পতেঙ্গা-খেজুরতলা সৈকতে পর্যটন উন্নয়নের পরিকল্পনা, তৈরি হবে আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬

চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থেকে খেজুরতলা পর্যন্ত প্রায় আড়াই কিলোমিটার সমুদ্রসৈকত পর্যটকদের জন্য নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নিয়েছে জেলা প্রশাসন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, পতেঙ্গায় গড়ে তোলা হবে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অবকাঠামো। অন্যদিকে খেজুরতলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও সবুজ পরিবেশ অক্ষুণ্ণ রেখে এলাকাটিকে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি পর্যটন খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এ পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য।

রোববার (৮ নভেম্বর) খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়ার কার্যক্রমে এসব পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় স্থানীয় সরকার ইনস্টিটিউটের (এনআইএলজি) মহাপরিচালক (সচিব) মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতের প্রায় আড়াই কিলোমিটার এলাকাজুড়ে রয়েছে অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। এখান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত—দুটিই উপভোগ করা যায়। যথাযথ পরিকল্পনার মাধ্যমে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে এলাকাটিকে আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের যৌথ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিবেশ সংরক্ষণ, ডেঙ্গু প্রতিরোধ এবং পর্যটন খাতের বিকাশে ভূমিকা রাখবে। এ ধরনের উদ্যোগ নিয়মিত চালু রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, তৈরি পোশাকশিল্প, কৃষি ও প্রবাসী আয়ের পাশাপাশি পর্যটনও দেশের অর্থনীতির চতুর্থ বৃহৎ শক্তি হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রাখে। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষায়িত পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতকে বিশ্বমানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা ও রাজস্ব আয়ের সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন জেলা প্রশাসনের সাপ্তাহিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের প্রশংসা করে বলেন, নিয়মিত এ ধরনের অভিযান ডেঙ্গুর প্রকোপ কমাতে সহায়ক হবে। পাশাপাশি চট্টগ্রামের পর্যটনকেন্দ্রগুলোর আধুনিকায়ন এবং পুরো জেলাকে পরিচ্ছন্নতার একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, গত জুলাই থেকে চট্টগ্রামকে পরিচ্ছন্ন, সুন্দর ও পর্যটনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে পতেঙ্গা ও খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘পতেঙ্গার ওয়েস্ট পয়েন্ট থেকে খেজুরতলার শেষ প্রান্ত পর্যন্ত পুরো সৈকত আমরা উন্মুক্ত করতে চাই। এলাকাটিকে নান্দনিকভাবে সাজানো হবে। তবে খেজুরতলার প্রাকৃতিক সবুজ পরিবেশ যতটা সম্ভব অক্ষুণ্ণ রাখা হবে।’

জেলা প্রশাসক জানান, গত বৃহস্পতিবার রাতে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের কাজও শুরু হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, পতেঙ্গা ও খেজুরতলায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের পর্যটন পরিবেশ তৈরি করা হবে। পতেঙ্গায় আধুনিক পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও খেজুরতলায় গুরুত্ব পাবে সবুজ পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।

খেজুরতলার পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা এই সৈকতকে নতুনভাবে বিশ্বের কাছে পরিচিত করতে চাই। এখানকার নির্মল বাতাস, সবুজ পরিবেশ এবং সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করবে।’

পর্যটনকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাকশিল্পের পাশাপাশি পর্যটন থেকেও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের সমুদ্রসৈকত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যথাযথভাবে তুলে ধরা গেলে দেশের অর্থনীতিতে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

তবে বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণই যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসক। পর্যটকদের নিরাপত্তা, উন্নত সেবা এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, ‘অন্যান্য দেশে বিদেশি পর্যটকদের যেভাবে সেবা দেওয়া হয়, আমাদেরও সেই মানের সেবা নিশ্চিত করতে হবে।’

এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ, গণমাধ্যম ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। চট্টগ্রামকে নান্দনিকভাবে গড়ে তুলতে বিভাগীয় প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ও সিটি করপোরেশন যৌথভাবে কাজ করছে বলেও জানান তিনি। এ ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেনের সহযোগিতা কামনা করেন জেলা প্রশাসক।

তিনি আরও বলেন, শুধু পতেঙ্গা ও খেজুরতলা নয়, চট্টগ্রামের অন্যান্য সম্ভাবনাময় এবং তুলনামূলকভাবে অপরিচিত পর্যটন এলাকাগুলোকেও পর্যায়ক্রমে নতুনভাবে তুলে ধরা হবে। এসব স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশ-বিদেশে পরিচিত করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা চান তিনি।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আমরা চাই, গণমাধ্যম চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও পর্যটনের সম্ভাবনাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরুক। বিশ্বের মানুষ জানুক, বাংলাদেশ কত সুন্দর একটি দেশ।’

পরিচ্ছন্নতা অভিযান প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক জানান, ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে চট্টগ্রামে প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে ৭ নভেম্বর রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি থাকায় এবার এক দিন পিছিয়ে রোববার এ কার্যক্রম আয়োজন করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করছি না, চট্টগ্রামকে নান্দনিকভাবে সাজানোর কাজও করছি। আমাদের সন্তানেরা যাতে সুন্দর পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে, সে জন্য নির্মল আনন্দের জায়গা তৈরি করতে হবে।’

মানুষ প্রকৃতিরই অংশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংরক্ষণের পাশাপাশি তা উপভোগের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। এ লক্ষ্যেই খেজুরতলা সমুদ্রসৈকতকে নতুনভাবে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই উদ্যোগকে পর্যটন উন্নয়নের নতুন সূচনা হিসেবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘আজকে আমাদের একটি নতুন যাত্রা শুরু হলো। আমরা শুধু পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, এই সমুদ্রসৈকতকে কীভাবে সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তা নিয়েও কাজ করব। বিশ্বের পর্যটকদের এখানে আসার আহ্বান জানাব।’

চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরা এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে জেলা প্রশাসনের এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর