বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পের পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণ ও আন্তঃসংযোগ নিশ্চিত করতে হবে: পানি সম্পদমন্ত্রী 

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পগুলোর পাশাপাশি প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ, খাল-নালা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ এবং সিটি কর্পোরেশনের কার্যকর সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি।

২৪ সেপ্টেম্বর বিকেলে টাইগারপাসস্থ চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন (চসিক) কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

পানি সম্পদমন্ত্রী বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই হবে না। প্রকল্প শেষ হওয়ার পর এসব অবকাঠামো কীভাবে পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে, পানি কীভাবে প্রবাহিত হবে এবং ছোট-বড় খাল, ড্রেন ও অন্যান্য জলপ্রবাহের মধ্যে কার্যকর সংযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—এসব বিষয় শুরু থেকেই পরিকল্পনায় রাখতে হবে।

তিনি বলেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ করছে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর খাল, ড্রেন ও পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, রক্ষণাবেক্ষণ ও দখলমুক্ত রাখার দায়িত্ব কার—তা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিপুল অর্থ ব্যয় করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল ধরে রাখা কঠিন হবে।

মন্ত্রী আরও বলেন, একটি এলাকার ড্রেন বা খালের সঙ্গে অন্য এলাকার পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকরভাবে যুক্ত না থাকলে কোথাও পানি আটকে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। তাই চলমান প্রকল্পের পাশাপাশি একটি সমন্বিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

প্রয়োজনে সিটি কর্পোরেশনের জন্য অতিরিক্ত বরাদ্দ, জনবল ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা নিশ্চিত করার কথাও বলেন তিনি। তাঁর মতে, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ না হলে কয়েক বছর পর আবারও একই ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

সভায় চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো একক সংস্থার পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ড, চসিক, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন এলাকায় খাল-নালা পরিষ্কার, সংস্কার ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা হয়েছে। গত বছরের তুলনায় অনেক এলাকায় পানি জমার সময় ও স্থায়িত্ব কমেছে বলেও তিনি দাবি করেন।

মেয়র জানান, এ বছর চট্টগ্রামে এক দিনে ৪১২ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। অতিবৃষ্টির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢল এবং পাহাড় কাটার ফলে সৃষ্ট মাটি-বালু খাল ও নালা ভরাট হয়ে যাওয়াকেও জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

চসিকের আওতাধীন প্রায় ৪০টি খাল নিয়ে একটি ডিপিপি রয়েছে উল্লেখ করে মেয়র বলেন, সেনাবাহিনীর বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের আওতায়ও বেশ কয়েকটি খালের সংস্কার ও পুনঃখননের কাজ চলছে। প্রকল্পভুক্ত খালগুলোর কাজ সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের মাধ্যমে এবং অন্যান্য খালের কাজ সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে করার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

চট্টগ্রাম-৮ আসনের সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ বলেন, বড় খাল সংস্কার ও সুইসগেট নির্মাণের পাশাপাশি ছোট নালা ও খালগুলোর সঙ্গে কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। ছোট নালা থেকে পানি বড় খালে পৌঁছাতে না পারলে বড় খাল সংস্কার করেও জলাবদ্ধতা পুরোপুরি নিরসন সম্ভব নয়।

তিনি বলেন, বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে নালা বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং রাস্তার নিচ দিয়ে পানি পারাপারের জন্য প্রয়োজনীয় ক্রস-ড্রেনেজ না থাকার বিষয়টি দেখা গেছে। এসব সমস্যা চিহ্নিত করে বর্ষার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেন, বিচ্ছিন্নভাবে কোনো একটি খাল বা নালা সংস্কার না করে পুরো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে। খাল সংস্কারের পাশাপাশি নালা সচল রাখা এবং ছোট খালগুলোর সঙ্গে বড় খালের কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, স্লুইসগেট ও পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামোর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পানি উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম ওয়াসা, সিটি কর্পোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।

সভায় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসনে সিডিএর চলমান প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খালের সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের কাজ করা হচ্ছে। এসব কাজ বাস্তবায়নে প্রায় ৫ হাজার ৭০০টি বৈধ ও অবৈধ স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে। কয়েকটি স্থাপনা অপসারণ এখনো বাকি রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, খাল সংস্কার ও পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি প্রকল্প শেষ হওয়ার পর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। এ জন্য পৃথক রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। খাল পুনরায় দখল, ভরাট ও ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ হয়ে গেলে চলমান প্রকল্পের সুফল ধরে রাখা কঠিন হবে।

সিডিএ চেয়ারম্যান আরও বলেন, জলাবদ্ধতা নিরসন একটি চলমান প্রক্রিয়া। খালের প্রবাহ, ধারণক্ষমতা, সংযোগ ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি খাল দখল ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ ঠেকাতে নজরদারি প্রয়োজন।

সভায় চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক সেলিম মো. জানে আলম, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার নুসরাত সুলতানা, অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার হোসাইন মোহাম্মদ কবির ভূঁইয়া, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক কর্নেল তারিকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বক্তব্য দেন।

মতবিনিময় সভায় মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে চলমান প্রকল্পের অগ্রগতি, খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার বর্তমান অবস্থা, পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা, খাল দখল ও ভরাট, রেগুলেটর ব্যবস্থাপনা এবং প্রকল্প-পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা হয়।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর