ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে নগরবাসীকে সচেতন ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণ এবং জ্বর হলে সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের গোলচত্বরে মশক নিধন ও পরিচ্ছন্নতা ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনাকালে তিনি এসব কথা বলেন। চসিকের এ কর্মসূচির আওতায় চমেক এলাকার বিভিন্ন স্থানে মশক নিধন, লার্ভা ধ্বংস ও প্রয়োজনীয় ওষুধ প্রয়োগ করা হয়। একই সঙ্গে সম্ভাব্য মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে তা ধ্বংস এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সচেতন করতে লিফলেট বিতরণ করা হয়।
মেয়র বলেন, ডেঙ্গু নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। জ্বর হলে অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে হবে এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নিতে হবে। বিশেষ করে জ্বর তিন দিন স্থায়ী হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানোর পাশাপাশি শারীরিক অবস্থার ওপর নজর রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এডিস মশার মাধ্যমে ডেঙ্গুর পাশাপাশি চিকুনগুনিয়া ও জিকা ভাইরাসসহ বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে। তাই এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা এবং নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা সবার দায়িত্ব।
মেয়র বলেন, “আগের কয়েক বছরের তুলনায় চলতি বছরে চট্টগ্রামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তবে আমরা চাই না ডেঙ্গুতে একজন মানুষও মারা যাক। এ জন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সিটি করপোরেশনের একার দায়িত্ব নয়; নাগরিকদেরও নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।”
ডেঙ্গু আক্রান্তদের করণীয় সম্পর্কে মেয়র বলেন, জ্বর হলে পর্যাপ্ত তরল খাবার গ্রহণ ও বিশ্রামে থাকতে হবে। শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে কি না, সেদিকে নজর রাখতে হবে। শরীরে র্যাশ দেখা দেওয়া, রক্তপাত, পায়খানা বা বমির সঙ্গে রক্ত যাওয়া কিংবা শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি জানান, ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পৃথক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেমন মাতৃসদন হাসপাতালেও ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষ সেন্টার চালু করা হয়েছে। সেখানে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার উদ্যোগের পাশাপাশি ডেঙ্গু পরীক্ষার ব্যবস্থাও করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
মেয়র বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশক নিধন, লার্ভা ধ্বংস, ওষুধ প্রয়োগ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রামও চালানো হচ্ছে। এ কার্যক্রমে বিএনসিসি, রেড ক্রিসেন্ট, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, তিন মাসব্যাপী পরিকল্পনার আওতায় চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ, পরিচ্ছন্নতা ও মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটরা মাঠপর্যায়ে এসব কার্যক্রম তদারক করছেন।
মেয়র বলেন, এডিস মশা সাধারণত জমে থাকা পানিতে বংশবিস্তার করে। তাই বাসাবাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, বালতি, ড্রাম, এসির নিচের ট্রে, নির্মাণাধীন ভবন ও পরিত্যক্ত পাত্রে পানি জমে আছে কি না, তা নিয়মিত পরীক্ষা করতে হবে। ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্রসহ যেসব স্থানে পানি জমতে পারে, সেগুলো দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
তিনি বলেন, “তিন দিনে একদিন, জমা পানি ফেলে দিন—এই অভ্যাস আমাদের প্রত্যেককে গড়ে তুলতে হবে। নিজের আঙিনা পরিষ্কার রাখুন, অন্যকেও সচেতন করুন। ডেঙ্গু প্রতিরোধ শুধু সিটি করপোরেশনের একার দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।”
চসিকের মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের বিষয়ে মেয়র জানান, ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব এলাকায় পরিস্থিতি অনুযায়ী বিশেষ মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) স্বীকৃত বিটিআই (BTI) ব্যবহারের পাশাপাশি নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ ও অ্যাডাল্টিসাইড স্প্রে করা হচ্ছে।
কর্মসূচিতে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আনিসুল হোসেন, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন, বিভাগীয় পরিচালক ডা. শেখ ফজলে রাব্বি, চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন সাজিদুর রহমান, ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি ডা. তমিজউদ্দিন আহমেদ মানিক, মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুস সাত্তার, অধ্যাপক ডা. হাবিব হাসান, ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ডা. বেলায়েত হোসেন ঢালী, ডা. ইফতেখার উদ্দিন লিটন, ড্যাব কেন্দ্রীয় কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল করিম চৌধুরী, ডা. এস এম সারওয়ার আলমসহ চিকিৎসক, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এই বাংলা/এমএস