মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

সাজেকে অবরোধ ঘিরে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি, ৪৮ ঘণ্টার নতুন ঘোষণা

রাঙামাটি প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬

রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটনকেন্দ্র সাজেকে চলমান সড়ক অবরোধ ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। পর্যটন সড়ক সচল করা এবং পাহাড়ে সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধের দাবিতে আগামী ৪ ও ৫ নভেম্বর টানা ৪৮ ঘণ্টার সর্বাত্মক অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি। অন্যদিকে, পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশন। তবে চলমান অবরোধের মধ্যেও কৃষিপণ্য পরিবহন এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহন চলাচলে ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংগঠন দুটি।

মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব কর্মসূচি ও সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অবস্থানে সাজেকের পর্যটন, কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা কার্যক্রম ও স্থানীয় জনজীবন নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিন্দু লাল চাকমা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাজেকের পর্যটন সড়ক অবিলম্বে সচল করা এবং পাহাড়ে সশস্ত্র তৎপরতা বন্ধের দাবিতে ৪ ও ৫ নভেম্বর শান্তিপূর্ণ ও সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক অবরোধ কর্মসূচি পালন করা হবে।

সংগঠনটির দাবি, গত ১১, ১৫ ও ২২-২৩ অক্টোবর এবং সর্বশেষ ২ নভেম্বর কয়েক দফা অবরোধের কারণে সাজেকের পর্যটন সড়ক কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এতে পর্যটননির্ভর ব্যবসা-বাণিজ্য, স্থানীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে না পারায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় যানবাহনের মালিক, চালক ও শ্রমিকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের আয়-রোজগারও বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে সংগঠনটি।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও অভিযোগ করা হয়, আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে এবং জরিমানার হুমকি দিয়ে সাধারণ মানুষকে অবরোধ পালনে বাধ্য করছে। নারী ও শিশু-কিশোরদের জোরপূর্বক মানবঢাল হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও তুলেছে সংগঠনটি। এ ছাড়া চাঁদাবাজি, অপহরণ ও হত্যার মতো কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তোলা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা কমিটি জানিয়েছে, তাদের ঘোষিত অবরোধ চলাকালে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসাসামগ্রী, গণমাধ্যম এবং জরুরি খাদ্যদ্রব্য বহনকারী যানবাহন চলাচল করতে পারবে। দাবি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরবর্তী সময়ে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে সংগঠনটি।

এদিকে, সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কারবারি অ্যাসোসিয়েশনের যৌথ সভায় চলমান অনির্দিষ্টকালের অবরোধের আওতামুক্ত যানবাহনের তালিকা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, উৎপাদিত কৃষিপণ্য পরিবহনের পাশাপাশি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বহনকারী যানবাহনও অবরোধের আওতামুক্ত থাকবে। বুধবার (৪ নভেম্বর) থেকে এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হবে।

সাজেক গণ অধিকার রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব বিজয় কান্তি চাকমা স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাজেকের পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে কৃষক, কৃষিপণ্য উৎপাদনকারী ও ব্যবসায়ীদের স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে সাজেকবাসীর পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের সড়ক অবরোধ অব্যাহত থাকবে বলে যৌথ সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে।

দুই সংগঠনের ঘোষণায় সাজেকের চলমান পরিস্থিতিতে ভিন্নমুখী অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। এক পক্ষ পর্যটন সড়ক সচল ও অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছে, অন্য পক্ষ পাঁচ দফা দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অবস্থানে রয়েছে। ফলে সাজেকের সড়ক যোগাযোগ স্বাভাবিক হওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।

এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পর্যটননির্ভর মানুষ। সড়ক যোগাযোগ দীর্ঘদিন ব্যাহত হলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে বিঘ্ন এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা সংকট আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে সাজেকের সুনাম ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অবরোধ ঘিরে সৃষ্ট সংকট নিরসনে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। সাংগঠনিক বিরোধের কারণে যেন মানুষের জীবন-জীবিকা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত না হয়, সে জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর