রবিবার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

শ্রেণিকক্ষ কি শুধু শেখার জায়গা, নাকি নিয়ন্ত্রণেরও কাঠামো?

তাহমিদা খানম
  • প্রকাশকালঃ শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬

প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও ভবিষ্যতের শ্রেণিকক্ষ নিয়ে বিশ্লেষণ

আমরা যে শ্রেণিকক্ষের সঙ্গে পরিচিত—সামনে একজন শিক্ষক, পেছনে সারিবদ্ধ ডেস্কে বসে থাকা শিক্ষার্থীরা, নির্দিষ্ট সময়সূচি, পাঠ্যক্রম ও পরীক্ষা—তা কি কেবল শিক্ষার্থীদের শেখানোর সুবিধার্থে তৈরি হয়েছিল? নাকি বিপুলসংখ্যক মানুষকে কম খরচে পরিচালনা, শ্রেণিবদ্ধ ও শৃঙ্খলার মধ্যে রাখার প্রশাসনিক প্রয়োজনও এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল?

আধুনিক প্রযুক্তি ও সমাজব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এলেও প্রচলিত শ্রেণিকক্ষের কাঠামো এখনো বহুলাংশে টিকে আছে। কেন এই ব্যবস্থা এত দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হয়েছে, তা বুঝতে হলে এর ইতিহাস, রাজনৈতিক অর্থনীতি এবং শিক্ষাদর্শের বিবর্তন বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

১. শ্রেণিকক্ষের উৎপত্তি ও ঐতিহাসিক বিবর্তন

সংগঠিত শিক্ষাকেন্দ্রের প্রমাণ প্রাচীন মেসোপটেমিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত। বর্তমান ইরাকের নিপ্পুরে প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে শনাক্ত ‘হাউস এফ’ নামের একটি স্থাপনা আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথমার্ধে লিপিশিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে শিক্ষার্থীরা কিউনিফর্ম লিপি, গণনা ও বিভিন্ন লিখনপদ্ধতি অনুশীলন করত। তবে এই শিক্ষাকেন্দ্রকে আধুনিক গণশিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। এটি ছিল মূলত সীমিতসংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য লিপিকর তৈরির প্রতিষ্ঠান।

বর্তমানের শ্রেণিভিত্তিক ও শিক্ষকনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার বিকাশ দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার ফল। এ ক্ষেত্রে অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে উদ্ভূত মনিটরিয়াল পদ্ধতি বা Bell–Lancaster Method গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

১৭৮৯ সালে ভারতের মাদ্রাজে অ্যান্ড্রু বেল (Andrew Bell) শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে শিক্ষাদানের একটি পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। পরবর্তী সময়ে ইংল্যান্ডে জোসেফ ল্যাঙ্কাস্টার (Joseph Lancaster) এ ধরনের পদ্ধতির বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এ ব্যবস্থায় অপেক্ষাকৃত অগ্রসর শিক্ষার্থীরা অন্য শিক্ষার্থীদের পাঠ বুঝতে সহায়তা করত। ফলে একজন প্রধান শিক্ষক তুলনামূলকভাবে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পরিচালনা করতে পারতেন।

পরবর্তী সময়ে বয়সভিত্তিক শ্রেণিবিন্যাস, নির্দিষ্ট পাঠ্যক্রম, পৃথক শ্রেণিকক্ষ এবং শিক্ষককেন্দ্রিক পাঠদান আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। তাই আধুনিক শ্রেণিকক্ষের কোনো একক আবিষ্কারক নেই; বরং এটি বিভিন্ন সময়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে।

২. শিক্ষার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রণ ও প্রশাসনিক দক্ষতার ভূমিকা

আধুনিক বিদ্যালয়ব্যবস্থার বিস্তারে শিক্ষার প্রয়োজনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, অর্থনীতি ও সামাজিক শৃঙ্খলার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

UNESCO-এর ২০২১/২২ সালের Global Education Monitoring Report অনুযায়ী, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্র শিক্ষিত কর্মশক্তি তৈরি এবং জাতীয় পরিচয় সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে সরকারি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী হয়ে ওঠে। একই বয়সের শিক্ষার্থীদের একটি শ্রেণিতে রাখা, অভিন্ন পাঠ্যক্রম, নির্দিষ্ট সময়সূচি ও অভিন্ন মূল্যায়নব্যবস্থা চালু করা প্রশাসনিকভাবে সুবিধাজনক ছিল।

এ ধরনের কাঠামো শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, অগ্রগতি ও ফলাফল পর্যবেক্ষণ সহজ করে। একই সঙ্গে একজন শিক্ষককে নির্দিষ্ট সময়ে অনেক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করার সুযোগ দেয়।

এ প্রসঙ্গে ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো (Michel Foucault) তাঁর Discipline and Punish (১৯৭৫) গ্রন্থে বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেছেন। তাঁর আলোচনায় সময়সূচি, পর্যবেক্ষণ, শ্রেণিবিন্যাস, নিয়মকানুন ও পরীক্ষাকে আধুনিক শৃঙ্খলামূলক ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে দেখা হয়েছে।

অর্থাৎ বিদ্যালয় শুধু জ্ঞান অর্জনের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নির্দিষ্ট সামাজিক নিয়ম, আচরণ ও প্রত্যাশার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচিত করে তোলার ক্ষেত্রও।

তবে বিদ্যালয়কে পুরোপুরি কারখানার অনুকরণ বলা ঐতিহাসিকভাবে যথাযথ নয়। ডেভিস, কনরয় ও ক্লাগের ২০২০ সালের Schools as Factories: The Limits of a Metaphor গবেষণায় দেখানো হয়েছে, শিল্পবিপ্লব ও উৎপাদনব্যবস্থার প্রভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর থাকলেও ‘বিদ্যালয় মানেই কারখানা’—এমন উপমা দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার পুরো ইতিহাস ব্যাখ্যা করা যায় না।

৩. আধুনিক যুগেও প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ কেন টিকে আছে?

প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন, অনলাইন শিক্ষা এবং বিকল্প শিক্ষাপদ্ধতির প্রসার সত্ত্বেও প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ এখনো টিকে আছে। এর পেছনে কয়েকটি বাস্তব কারণ রয়েছে।

প্রথমত, প্রচলিত শ্রেণিব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে কম খরচে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে পরিচালনার সুযোগ দেয়। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে এই কাঠামোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে।

এ ছাড়া অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও সমাজের বড় একটি অংশের কাছে প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ পরিচিত ও গ্রহণযোগ্য। ফলে বিকল্প ব্যবস্থা চালু করতে শুধু নতুন প্রযুক্তি বা আসবাবপত্রের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক ও মানসিক পরিবর্তনও।

ডেভিড টাইয়াক ও ল্যারি কিউবানের Tinkering Toward Utopia (১৯৯৫) গ্রন্থে বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক রীতি ও কাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাঁদের বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার নিয়ে আলোচনা যত ব্যাপকই হোক, শ্রেণিকক্ষের দৈনন্দিন চর্চায় পরিবর্তন আনা তুলনামূলক কঠিন।

৪. বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রভাব

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার নীতি, অর্থায়ন, মূল্যায়ন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরও ভূমিকা রয়েছে।

UNESCO, বিশ্বব্যাংক ও OECD বিভিন্ন দেশের শিক্ষানীতি, গবেষণা, অর্থায়ন এবং শিক্ষার মান মূল্যায়নে প্রভাব বিস্তার করে। এসব প্রতিষ্ঠানের সুপারিশ ও মূল্যায়ন অনেক সময় জাতীয় পর্যায়ের শিক্ষা সংস্কার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

এ বিষয়ে এডওয়ার্ডস ও তাঁর সহগবেষকদের ২০২৪ সালে Review of Educational Research সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনা উল্লেখযোগ্য। সেখানে বিশ্বব্যাংকের শিক্ষানীতিতে প্রভাব বিস্তারের বিষয়টি বিশ্লেষণ করতে ৭০টি প্রকাশনা পর্যালোচনা করা হয় এবং নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তারের ১১টি পথ চিহ্নিত করা হয়। এর মধ্যে অর্থায়ন, নীতিগত পরামর্শ, গবেষণা ও জ্ঞান উৎপাদনের মতো বিষয় রয়েছে।

অন্যদিকে, OECD-এর PISA আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন বিভিন্ন দেশের শিক্ষার মান ও নীতিগত অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনায় প্রভাব ফেলেছে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পাঠ্যবই, মূল্যায়ন, শিক্ষা প্রযুক্তি ও বিভিন্ন শিক্ষা-সেবা খাতে বাণিজ্যিকভাবে যুক্ত হয়েছে।

তবে এসব তথ্য থেকে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই যে কোনো নির্দিষ্ট বৈশ্বিক শক্তি পরিকল্পিতভাবে পৃথিবীর সব শিক্ষার্থীকে পুরোনো শ্রেণিকক্ষে আটকে রেখেছে। বরং এখানে রাষ্ট্রীয় নীতি, অর্থনৈতিক স্বার্থ, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও সামাজিক প্রত্যাশার সম্মিলিত প্রভাব কাজ করে।

৫. প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ পরিবর্তনের সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব

শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক, সহযোগিতামূলক ও নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করলে শেখার অভিজ্ঞতায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে।

বিশ্লেষণী ও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ: Active Learning বা সক্রিয় শিখনপদ্ধতিতে শিক্ষার্থীরা শুধু শিক্ষকের কাছ থেকে তথ্য গ্রহণ করে না; বরং প্রশ্ন করে, যুক্তি উপস্থাপন করে, আলোচনা করে এবং সমস্যা সমাধানে অংশ নেয়।

স্কট ফ্রিম্যান ও তাঁর সহগবেষকদের ২০১৪ সালে PNAS সাময়িকীতে প্রকাশিত ২২৫টি গবেষণার মেটা-বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (STEM) বিষয়ে সক্রিয় শিখনপদ্ধতিতে পরীক্ষার ফল প্রচলিত বক্তৃতানির্ভর শিক্ষার তুলনায় গড়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি ছিল। একই বিশ্লেষণে প্রচলিত লেকচারভিত্তিক ক্লাসের শিক্ষার্থীদের অকৃতকার্য হওয়ার সম্ভাবনা সক্রিয় শিখনপদ্ধতির শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রায় ১ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া যায়।

সহযোগিতা ও যোগাযোগের দক্ষতা: দলগত কাজ, আলোচনা ও যৌথ সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক যোগাযোগ, দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার দক্ষতা বাড়তে পারে।

Education Endowment Foundation (EEF)-এর পর্যালোচনায় কাঠামোবদ্ধ Collaborative Learning বা সহযোগিতামূলক শিখনপদ্ধতির সঙ্গে গড়ে অতিরিক্ত পাঁচ মাসের শিক্ষাগত অগ্রগতির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এ ক্ষেত্রে তিন থেকে পাঁচজনের ছোট দল এবং প্রত্যেক সদস্যের সক্রিয় অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।

স্বাধীনভাবে শেখার সক্ষমতা: একজন শিক্ষার্থী কীভাবে নিজের শেখার পরিকল্পনা করবে, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং ভুল সংশোধন করবে—এসব দক্ষতা ভবিষ্যৎ শিক্ষাজীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

EEF-এর ৩৫৫টি গবেষণাভিত্তিক Metacognition and Self-regulation পর্যালোচনায় এ ধরনের কৌশলের সঙ্গে গড়ে অতিরিক্ত আট মাসের শিক্ষাগত অগ্রগতির সম্পর্ক উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দলগত প্রকল্প, বিতর্ক, গবেষণা, উপস্থাপনা ও বাস্তব সমস্যাভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব, দায়িত্বশীলতা এবং বাস্তব জীবনে অর্জিত জ্ঞান প্রয়োগের সুযোগ বাড়াতে পারে।

৬. আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সম্ভাব্য নেতিবাচক দিক

শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তন মানেই স্বয়ংক্রিয় উন্নতি নয়। যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন ছাড়া নতুন পদ্ধতিও নানা সমস্যা তৈরি করতে পারে।

মনোযোগের ঘাটতি ও বিশৃঙ্খলা: একই শ্রেণিকক্ষে একাধিক দল একসঙ্গে কাজ করলে শব্দ ও পারস্পরিক বিঘ্ন বাড়তে পারে। ফলে কিছু শিক্ষার্থীর মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

অসম অংশগ্রহণ: দলগত কাজে আত্মবিশ্বাসী বা নেতৃত্বদানে দক্ষ শিক্ষার্থীরা বেশি প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে চুপচাপ বা কম আত্মবিশ্বাসী শিক্ষার্থীরা নিষ্ক্রিয় থেকে যেতে পারে। EEF-এর পর্যালোচনাতেও বলা হয়েছে, সঠিক দায়িত্ব বণ্টন ও শিক্ষকীয় তত্ত্বাবধান ছাড়া সহযোগিতামূলক শিখন কার্যকর হয় না।

শিক্ষকের কর্মচাপ: প্রত্যেক শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, ব্যক্তিভিত্তিক প্রতিক্রিয়া দেওয়া এবং বিভিন্ন কার্যক্রম মূল্যায়নের জন্য শিক্ষকের বাড়তি সময়, প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতি প্রয়োজন।

আর্থিক বৈষম্য: নমনীয় আসবাবপত্র, গবেষণাগার, প্রযুক্তি ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যয় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বাধা হতে পারে। বিশেষ করে আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে এসব সুবিধা নিশ্চিত করা কঠিন।

প্রযুক্তিনির্ভরতার ঝুঁকি: UNESCO-এর ২০২৩ সালের Global Education Monitoring Report: Technology in Education প্রতিবেদনে ডিজিটাল বৈষম্য, প্রযুক্তির অনুপযুক্ত ব্যবহার, শিক্ষার্থীদের মনোযোগে বিঘ্ন এবং ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে। তাই প্রযুক্তি শিক্ষক ও সরাসরি শিক্ষাদানের বিকল্প নয়; বরং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক মাধ্যম হওয়া উচিত।

৭. ভবিষ্যতের জন্য কোন শিক্ষাব্যবস্থা অধিক বিবেচনাযোগ্য?

প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ পুরোপুরি বিলুপ্ত করা কিংবা সব সময় শিক্ষার্থীদের দলবদ্ধভাবে বসিয়ে রাখা—কোনোটিই একক সমাধান নয়। বরং শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন, বিষয়বস্তু ও প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনায় Hybrid and Flexible Learning Model বা সমন্বিত ও নমনীয় শিক্ষাব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।

এ ব্যবস্থায় শিক্ষক প্রয়োজন অনুযায়ী সরাসরি পাঠদান করবেন। শিক্ষার্থীরা ছোট দলে আলোচনা, গবেষণা ও সমস্যা সমাধানে অংশ নেবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত অনুশীলন, বাস্তবভিত্তিক প্রকল্প এবং প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে।

মূল্যায়নও শুধু পরীক্ষার নম্বরে সীমাবদ্ধ না রেখে বিশ্লেষণী ক্ষমতা, যুক্তি উপস্থাপন, সৃজনশীলতা, সহযোগিতা ও বাস্তবে জ্ঞান প্রয়োগের দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে পারে।

UNESCO-এর ২০২১ সালের Reimagining Our Futures Together প্রতিবেদনেও সহযোগিতামূলক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

শেষ কথা

প্রচলিত শ্রেণিকক্ষ একসময় গণশিক্ষার বিস্তার, স্বল্প ব্যয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পরিচালনা এবং রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থা গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু কোনো ঐতিহাসিকভাবে কার্যকর ব্যবস্থা ভবিষ্যতের জন্য অপরিবর্তনীয় আদর্শ হতে পারে না।

শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন মানে শুধু স্মার্টবোর্ড, কম্পিউটার বা ডিজিটাল প্রযুক্তি সংযোজন নয়; বরং শিক্ষাদান, মূল্যায়ন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক এবং শ্রেণিকক্ষের কাঠামোকে নতুনভাবে বিবেচনা করা।

একটি আদর্শ শ্রেণিকক্ষ সেই কক্ষ নয়, যেখানে সব শিক্ষার্থী একইভাবে বসে থাকে; বরং সেটিই আদর্শ শিক্ষার পরিবেশ, যেখানে প্রত্যেক শিক্ষার্থী বোঝার, প্রশ্ন করার, যুক্তি দেওয়ার, ভুল থেকে শেখার এবং নিজের সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়।

তাহমিদা খানম                                               শিক্ষার্থী, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর