শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক শিক্ষার্থীর বিপরীতে ১৯ শিক্ষক-কর্মচারী, মাসে সরকারি বেতন-ভাতা সাড়ে ৪ লাখ টাকা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার একটি এমপিওভুক্ত দাখিল মাদ্রাসায় নথিতে শিক্ষার্থী ১৮৮ জন থাকলেও সরেজমিনে শ্রেণিকক্ষে পাওয়া গেছে মাত্র একজনকে। প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ১৯ জন। তাঁদের বেতন-ভাতা বাবদ প্রতি মাসে সরকারি কোষাগার থেকে দেওয়া হচ্ছে ৪ লাখ ৪৫ হাজার ৬৫৪ টাকা।

ঘটনাটি রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের সোমনারায়ণ মৌজার হাসারপাড় বড়বাড়ি গ্রামের বড়বাড়ী মহসিনিয়া দাখিল মাদ্রাসার।

বৃহস্পতিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, অষ্টম শ্রেণির শ্রেণিকক্ষে একমাত্র শিক্ষার্থী মোছা. বৃষ্টি আক্তার বসে আছে। অন্য কোনো শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি দেখা যায়নি। এ সময় কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারীকে শ্রেণিকক্ষের বাইরে গল্প-আড্ডা ও মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে দেখা যায়। একটি কক্ষে এক শিক্ষিকার শিশুকে মেঝেতে শুয়ে থাকতে দেখা যায় এবং পাশে কয়েকজন শিক্ষিকা পারিবারিক বিষয়ে কথা বলছিলেন।

প্রতিষ্ঠানের নথি অনুযায়ী, মাদ্রাসায় পঞ্চম শ্রেণিতে ২২ জন, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২৪, সপ্তমে ২৭, অষ্টমে ৩৪, নবমে ৪১ এবং দশম শ্রেণিতে ৪০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে কোনো শিক্ষার্থী নেই। সব মিলিয়ে নথিতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৮৮ জন।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানটিতে শিক্ষক রয়েছেন ১৪ জন এবং কর্মচারী পাঁচজন। অর্থাৎ নথিভুক্ত শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ১৯ জন।

অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী বৃষ্টি আক্তার বলেন, “আমরা মাদ্রাসায় প্রতিদিন পাঁচ-ছয়জন করে আসি। ক্লাস বেশি হয় না। তাই শিক্ষার্থীও আসে না।”

প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থী উপস্থিতির পাশাপাশি চলতি বছরের দাখিল পরীক্ষার ফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বছর মাদ্রাসাটি থেকে ৩১ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে মাত্র দুজন পাস করেছে বলে প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দা মো. নুর ইসলাম অভিযোগ করেন, কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী দেখানো হলেও দাখিল পরীক্ষার সময় হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়। তাঁদের অটোভাড়া, খাবার ও পকেট খরচ দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি।

সাবেক শিক্ষার্থী মো. সাগর ইসলামও একই ধরনের অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, মাদ্রাসা থেকে পাস করার পর তিনি অন্যের হয়ে তিনবার প্রক্সি পরীক্ষা দিয়েছেন। এ জন্য তাঁকে অটোভাড়া ও পকেট খরচ দেওয়া হয়েছিল বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

মাদ্রাসার শিক্ষক মো. সামছুল হক বলেন, “মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থী এমনিতেই কম। সেটা সবাই জানে।”

সহকারী সুপার মো. আব্দুস সুবহান বলেন, মাদ্রাসাটি তিস্তা নদীর পাশে এবং হিন্দু অধ্যুষিত এলাকায় হওয়ায় শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না।

সুপারিনটেনডেন্ট মো. শাহালম বলেন, আশপাশের প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসায় আসে না। হাফেজিয়া মাদ্রাসা থেকে যারা ভর্তি হয়, তাদের অনেকেই গণিত ও ইংরেজিতে দুর্বল।

মাদ্রাসার সভাপতি ও কুড়িগ্রাম সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মো. লাল মিঞা সরকার বলেন, শিক্ষার্থীদের অনুপস্থিতির বিষয়টি তিনি অবগত। নদী এলাকা ও হিন্দু অধ্যুষিত হওয়ার কারণে শিক্ষার্থী পাওয়া যায় না বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি জানান, আগামীতে শিক্ষার্থীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের মাদ্রাসামুখী করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

রাজারহাট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, “দুই-একদিনের মধ্যে পরিদর্শন করাবো। সমস্যা পাওয়া গেলে অবশ্যই রিপোর্ট করে পাঠিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

উল্লেখ্য, বড়বাড়ী মহসিনিয়া দাখিল মাদ্রাসাটি ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং ১ জানুয়ারি ১৯৮৬ সালে স্বীকৃতি পায়। প্রতিষ্ঠানটির EIIN নম্বর ১২২৫১৭ এবং ইনস্টিটিউশন নম্বর ৮৮০৭০৫২১০২।

নথিতে ১৮৮ শিক্ষার্থী, ১৯ শিক্ষক-কর্মচারী এবং মাসে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা সরকারি বেতন-ভাতা দেওয়ার তথ্যের বিপরীতে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি অত্যন্ত কম থাকার বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর