বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি)-এর বাস্তবায়নাধীন ‘বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলা সেচ উন্নয়ন প্রকল্প’-এর বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনায় (এপিপি) সরকারি ক্রয় আইন (পিপিএ) ও বিধিমালার (পিপিআর) সুস্পষ্ট লঙ্ঘনের চাঞ্চল্যকর তথ্য মিলেছে। উচ্চতর কর্তৃপক্ষের আর্থিক অনুমোদন এড়ানো এবং পছন্দের বলয়কে সুবিধা পাইয়ে দিতে মোট ৩৪৮ কোটি ৯১ লাখ টাকার প্রকল্পের এক বছরের কেনাকাটাতেই প্রায় ১৩০ কোটি টাকার কাজকে কৃত্রিমভাবে খণ্ডবিখণ্ড করা হয়েছে। একই সঙ্গে শত শত পূর্ত ও পণ্য ক্রয়ের দরপত্র আহ্বান থেকে শুরু করে চুক্তি স্বাক্ষর পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া একই তারিখে শেষ করার এক অস্বাভাবিক দাপ্তরিক নকশা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
বিএডিসির কেন্দ্রীয় মনিটরিং বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ৩৪৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পটি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নের জন্য অনুমোদিত হয়। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রকল্পটির বিপরীতে কোনো দৃশ্যমান এডিপি বরাদ্দ না থাকলেও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে হঠাৎ করেই ১৩ হাজার লাখ (১৩০ কোটি) টাকার সুবিশাল বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা অনুমোদন করা হয়। এর মধ্যে রাজস্ব খাতে ৩ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, পণ্য ক্রয়ে ৩০ কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং মূলধনী পূর্ত কাজে ৯৫ কোটি ৭৭ লাখ টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যার শতভাগ অর্থ জোগান দেওয়ার কথা সরকারি তহবিল (জিওবি) থেকে।
পিপিআর লঙ্ঘন করে খণ্ডবিখণ্ড প্যাকেজ
পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর, ২০০৮)-এর বিধি ১৭ এবং বিধি ৩৭(২) অনুযায়ী, উচ্চতর কর্তৃপক্ষের অনুমোদন প্রক্রিয়া এড়াতে কিংবা উন্মুক্ত দরপত্রের প্রতিযোগিতা সংকুচিত করতে কোনো অভিন্ন কাজকে কৃত্রিমভাবে একাধিক ছোট প্যাকেজে বিভক্ত করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, প্রকল্পভুক্ত চার জেলার খাল পুনঃখনন ও কালভার্ট নির্মাণের কাজগুলোকে পাইকারি হারে একই দৈর্ঘ্য ও একই অঙ্কে খণ্ডবিখণ্ড করা হয়েছে।
প্রকল্প নথির তথ্য অনুসারে, খাল পুনঃখননের ক্ষেত্রে ডব্লিউডি-৩ এবং ডব্লিউডি-৫ সিরিজের অধীনে অন্তত ৫০টির বেশি প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে। আশ্চর্যজনকভাবে প্রতিটি প্যাকেজের কাজের দৈর্ঘ্য দেখানো হয়েছে হুবহু ২ কিলোমিটার এবং প্রতিটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ঠিক ২৭ লাখ টাকা। একইভাবে কৃষি সরঞ্জাম ও যান চলাচলের সুবিধার্থে ফুটব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণের প্রায় ৩০টি প্যাকেজের প্রতিটিতে দুটি করে কাঠামো এবং হুবহু ৫৩ লাখ ৭৬ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া পাম্প হাউস নির্মাণের প্রতিটি প্যাকেজে ৫টি করে ইউনিট ও ব্যয় ১৮ লাখ টাকা এবং ভূগর্ভস্থ পাইপলাইনে ৩টি করে ইউনিট ও ব্যয় ৩৬ লাখ টাকা নির্ধারণ করে প্যাকেজ ভাগ করা হয়েছে।
ক্রয় বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি আর্থিক ক্ষমতা অর্পণ (ডিওএফপি) অনুযায়ী প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) নিজস্ব আর্থিক অনুমোদনসীমার মধ্যে রাখতে এবং বোর্ড বা মন্ত্রণালয়ের তদারকি এড়াতেই এভাবে মনগড়া বিভাজন করা হয়েছে।
কোটি টাকার পণ্য ক্রয়েও ‘পিডি’ই সর্বেসর্বা
সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুযায়ী, বড় অঙ্কের পণ্য ক্রয়ে সংস্থা প্রধান, পরিচালনা পর্ষদ কিংবা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই প্রকল্পের পণ্য (Goods) ক্রয়ের বড় প্যাকেজগুলোতেও চুক্তি অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ (Contract Approving Authority) হিসেবে শুধু ‘PD’ (প্রকল্প পরিচালক)-এর নাম রাখা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, জিডি-১০ প্যাকেজে ২-কিউসেক ক্ষমতার ১৮০টি বৈদ্যুতিক এলএলপি পাম্প সেট ক্রয়ে ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা এবং জিডি-১৭.৩ ও ১৮ প্যাকেজে ভূগর্ভস্থ পাইপ ক্রয়ে ৮ কোটি টাকার কেনাকাটাতেও অনুমোদনকারী হিসেবে পিডিকেই রাখা হয়েছে।
অবাস্তব ও সাজানো সময়সূচি
ক্রয় পরিকল্পনার সময়সূচি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কয়েক শত স্বতন্ত্র পূর্ত ও পণ্য প্যাকেজের দরপত্র প্রকাশের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে একই দিন—২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট। শুধু তাই নয়, সব দরপত্র উন্মুক্তকরণ (৩০ আগস্ট ২০২৪), মূল্যায়ন সম্পন্নকরণ (১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪), নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড বা এনওএ (২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪) এবং চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ (২৬ অক্টোবর ২০২৪) হুবহু একই রাখা হয়েছে।
প্রকৌশল ও দরপত্র বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি প্রকল্প পরিচালকের সীমিত জনবল দিয়ে একই দিনে শত শত স্বতন্ত্র প্যাকেজের দরপত্র উন্মুক্ত করে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে সেগুলোর কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়ন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সম্পন্ন করা প্রশাসনিকভাবে অসম্ভব। এই অবাস্তব ক্যালেন্ডার মূলত সাজানো দরপত্র (Bid Rigging)-এর মাধ্যমে বিশেষ সিন্ডিকেটকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার দাপ্তরিক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।
স্বাক্ষর ও প্রশাসনিক ফাঁক
দাপ্তরিক নথির অনুমোদন প্রক্রিয়ায় গুরুতর সময়ক্রমিক অসংগতি ধরা পড়েছে। নথিতে দেখা যায়, প্রকল্প পরিচালক সৈয়দ ওয়াহিদ মুরাদ ক্রয় পরিকল্পনায় স্বাক্ষর করেছেন ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই। অথচ এর দেড় মাস আগেই বিএডিসি সদর দপ্তরের সহকারী প্রধান প্রকৌশলী-৩ নথিতে স্বাক্ষর করেছেন ২০২৪ সালের ৩ জুন। প্রকল্প প্রধান প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপনের আগেই ঊর্ধ্বতন কারিগরি কর্মকর্তা কীভাবে নথিতে সম্মতি দিলেন, তা প্রশাসনিক নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
এদিকে চার উপকূলীয় জেলা—বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুরের নদী ও খালের গঠনগত বৈশিষ্ট্য, জোয়ার-ভাটা এবং মাটির ধরন সম্পূর্ণ আলাদা হওয়া সত্ত্বেও কোনো বাস্তবসম্মত সমীক্ষা ছাড়াই ‘কপি-পেস্ট’ প্রাক্কলন ও অস্বচ্ছ ক্রয় পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে। অনুসন্ধান চলমান
এই বাংলা/এমএস