মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬

নতুন সরবরাহকারী তালিকাভুক্তিতে অনীহা, পুরোনোদের দখলে রেলের স্পেয়ার পার্টস সরবরাহ

তানভীর আহমেদ, বিশেষ প্রতিবেদক
  • প্রকাশকালঃ মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬
বাংলাদেশ রেল ও পূর্বাঞ্চলীয় রেল ভবন © সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনে ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের স্পেয়ার পার্টস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা পড়ার পর সাত দফা পিছিয়েছে কার্যক্রম। সর্বশেষ ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর আবেদনপত্র উন্মুক্ত করা হলেও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এর মধ্যে চলমান প্রক্রিয়া বাতিল করে পুনরায় তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন আবেদনকারীরা। তাঁদের আশঙ্কা, দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহে প্রভাবশালী অবস্থানে থাকা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের স্বার্থ রক্ষায় এমন উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর পাহাড়তলী স্টোরের প্রধান নিয়ন্ত্রক ফরিদ আহমেদের স্বাক্ষরে তালিকাভুক্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ৭ ও ৮ অক্টোবর আবেদন গ্রহণ এবং ৮ অক্টোবর আবেদনপত্র খোলার কথা ছিল। তবে কয়েক দফা পিছিয়ে শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর আবেদনপত্র উন্মুক্ত করা হয়। এরপর আবেদন যাচাই-বাছাই ও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আবেদনকারীর অভিযোগ, যোগ্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম, সব আইটেম সরবরাহের অনুমোদন নেই, তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬০ থেকে ৮০টিতে উন্নীত করার প্রয়োজনীয়তা এবং কয়েকজন ব্যবসায়ীর রাজনৈতিক পরিচয়সহ বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে চলমান প্রক্রিয়া বাতিলের চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে পরিচালক (লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণ) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামসহ রেলওয়ের আরও দুই কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা যায়নি।

আইটেমভিত্তিক যোগ্যতা যাচাইয়ের দাবি

আবেদনকারীদের ভাষ্য, ২০১৬ সালের তালিকাভুক্তির সময়ও সব প্রতিষ্ঠানকে সব ধরনের স্পেয়ার পার্টস সরবরাহের অনুমোদন দেওয়া হয়নি। বরং প্রতিষ্ঠানভেদে নির্দিষ্ট আইটেম সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে BR Kit List-এ নতুন যন্ত্রাংশ যুক্ত হওয়ায় সব আইটেমের জন্য প্রস্তুতকারকের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা অর্জন করাও কঠিন।

তাঁদের প্রশ্ন, কয়েকটি আইটেমের অনুমোদন না থাকার কারণে পুরো তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়া বাতিল করার যৌক্তিকতা কোথায়? কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট আইটেম সরবরাহের যোগ্যতা না থাকলে সেই আইটেমের ক্ষেত্রে আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে বলে মনে করেন তাঁরা।

পুরোনো তালিকা বহাল রাখার অভিযোগ

আবেদনকারীদের দাবি, ২০২১ সালে Tender No. P6/DSL/Supplier-Enlistment/2021-এর মাধ্যমে নতুন প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০ জানুয়ারি ২০২১ তারিখের ওই প্রক্রিয়ায় আবেদনপত্র খোলার সময় কয়েক দফা পেছানোর পর শেষ পর্যন্ত তা বাতিল করা হয়। তাঁদের অভিযোগ, আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কম দেখিয়ে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR) অনুসরণ না করেই প্রক্রিয়াটি বাতিল করা হয়েছিল এবং ২০১৬ সালের পুরোনো তালিকা বহাল রাখা হয়।

আবেদনকারীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের প্রক্রিয়ায় ২০১৬ সালের তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে মাত্র পাঁচটির নথিপত্র গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—

১. DLL Inc. — কানাডা

২. Hitesi Industries — কানাডা

৩. Maven Engineering Corporation — যুক্তরাষ্ট্র

৪. Indo German Industries — ভারত

৫. PowerRail — যুক্তরাষ্ট্র (২০২১ সালে নতুন আবেদনকারী প্রতিষ্ঠান)

তবে এসব প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট মূল্যায়ন নথি দিয়ে যাচাই করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে, ২০২৪ সালের তালিকাভুক্তি প্রক্রিয়ার স্মারক নম্বর 54.01.1543.455.07.037.24-এর অধীনে ৫৪টি প্রতিষ্ঠান আবেদন জমা দেয়। আবেদনকারীদের প্রশ্ন, এতগুলো আবেদন জমা পড়ার পরও কেন প্রক্রিয়াটি চূড়ান্ত পর্যায়ে নেওয়া হচ্ছে না?

পুরোনো সরবরাহকারীদের সুবিধা দেওয়ার আশঙ্কা

আবেদনকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে তালিকাভুক্ত ৩৮টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টি প্রতিষ্ঠান ২০২৪ সালের নতুন তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করেছে। তাঁদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পাঁচ থেকে ছয়টির নথিপত্রের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আবেদনকারী ওই ১৮ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার আটটি, ভারতের সাতটি এবং বাংলাদেশের তিনটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

আবেদনকারীদের আরও অভিযোগ, পুরোনো তালিকার ১০ থেকে ১৫টি প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সরবরাহ কার্যক্রমে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের বিশেষ সুবিধাভিত্তিক সম্পর্ক থাকার অভিযোগও করেছেন তাঁরা। তাঁদের আশঙ্কা, নতুন প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হলে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বিদ্যমান একচেটিয়া সুবিধা কমতে পারে। এ কারণে একটি মহল বর্তমান প্রক্রিয়া বাতিলের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে তাঁদের দাবি।

এ ছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুতকারক-অনুমোদন বা Authorisation বাতিল হলেও পুরোনো পরিচয়ে ব্যবসা চালানোর অভিযোগ তুলেছেন আবেদনকারীরা। তাঁদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনের বৈধতা এবং প্রস্তুতকারকের সঙ্গে প্রতিনিধিত্বের সম্পর্ক যাচাই করা উচিত। শুধু আগের তালিকাভুক্তির পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে যোগ্য বিবেচনা না করে সবার আবেদন একই মানদণ্ডে মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

আবেদনকারীদের মতে, কোনো প্রতিষ্ঠানের নথিপত্রে অসংগতি থাকলে তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্রে সমস্যা থাকার কারণে পুরো প্রক্রিয়া বাতিল বা পুনরায় তালিকাভুক্তির উদ্যোগ নেওয়া কতটা যৌক্তিক, সে প্রশ্নও তুলেছেন তাঁরা।

তাঁদের দাবি, ২০১৬ সালের তালিকাভুক্তি, ২০২১ সালের বাতিল হওয়া প্রক্রিয়া এবং ২০২৪ সালের বর্তমান আবেদন—এই তিন পর্যায়ের নথি তুলনামূলকভাবে পর্যালোচনা করে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট নথিপত্র প্রকাশ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন আবেদনকারীরা।

রেলওয়ের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পরিচালক (লোকোমোটিভ রক্ষণাবেক্ষণ) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমি এই টেন্ডার প্রক্রিয়া যাচাই-বাছাইয়ের টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য। এর বাইরে আমার আর কোনো ভূমিকা নেই। আমি ট্রান্সফার হয়ে যাচ্ছি। খুব শিগগিরই সিদ্ধান্ত চলে আসবে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি আমার প্রতিবেদন মূল্যায়ন কমিটির কাছে পাঠিয়েছি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মূল্যায়ন কমিটি গ্রহণ করবে।”

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর