বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

চিকিৎসার অর্থসংকটে অসহায় ১১ জন, মেয়ের বিয়েতেও সহায়তা দিলেন চট্টগ্রামের ডিসি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সাপ্তাহিক গণশুনানিতে এসে নিজেদের দুর্দশার কথা তুলে ধরেন অসুস্থ ও অসহায় মানুষ। কারও ক্যান্সারের চিকিৎসা অর্থাভাবে বন্ধ, কেউ চোখের ছানি অপারেশন করাতে পারছেন না। কেউ অসুস্থ স্বামী-সন্তানের চিকিৎসা ও সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন, আবার কারও চিন্তা ছোট বোনের বিয়ের ব্যয় নিয়ে। তাঁদের কথা শুনে অসুস্থ ও অসহায় ১১ জনকে এবং বিয়ের জন্য একজনকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।

বুধবার (২৮ অক্টোবর) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে সরাসরি অংশ নেন ২৪ জন। পাশাপাশি অনলাইনে যুক্ত হন পাঁচজন প্রবাসী। তাঁদের অভিযোগ ও দুর্ভোগের কথা শুনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। দিনব্যাপী এ আয়োজনে উঠে আসে চিকিৎসার ব্যয়, কর্মহীনতা, পারিবারিক দায়িত্ব ও আর্থিক সংকটে থাকা মানুষের নানা সমস্যার চিত্র।

জন্মগতভাবে দুই পায়ে ত্রুটি নিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন শেফালীকা নাহার। স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে না পারায় অন্যের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁকে। চলতি বছরের এপ্রিলে স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর দুর্ভোগ আরও বেড়েছে। অসুস্থ ও বেকার ছেলেকে নিয়ে পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় মানুষের সহযোগিতায় দিন কাটছে তাঁর। নিজের চিকিৎসার জন্য ২০ হাজার টাকা সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করেন তিনি।

একই গণশুনানিতে সহায়তার আবেদন নিয়ে আসেন বাউলশিল্পী নান্টু দেবনাথ। গান গেয়ে উপার্জিত অর্থেই চলত তাঁর সংসার। কিন্তু ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ধারদেনায় জর্জরিত হয়েছেন তিনি। অর্থের অভাবে পরবর্তী চিকিৎসা বন্ধ রয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করেন নান্টু। তাঁর চিকিৎসায় আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।

সন্তানের ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে আসেন দিনমজুর মো. সুজন। ধারদেনা করে ছেলেকে দুই দফা কেমোথেরাপি দিলেও পরবর্তী চিকিৎসার অর্থ জোগাড় করতে পারছেন না তিনি। অন্যদিকে, বিধবা দিলোয়ারা চার ছেলেকে নিয়ে সংসার চালানোর পাশাপাশি এক ছেলের পেটের টিউমারের চিকিৎসা করাতে গিয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছেন। সন্তানের চিকিৎসা চালিয়ে যেতে না পেরে তিনিও জেলা প্রশাসকের দ্বারস্থ হন।

গণশুনানিতে নিজের সমস্যার কথা তুলে ধরেন মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ। দীর্ঘ ২১ বছর ওমানে কাজ করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন তিনি। দেশে ফেরার পর এখন নিজের হৃদ্‌রোগ এবং স্ত্রীর ডায়াবেটিসের চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। পাঁচ সদস্যের সংসারে পর্যাপ্ত আয় না থাকায় চিকিৎসা ও দৈনন্দিন খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে তাঁর জন্য।

এ কে এম ফজলুল হকের দুর্ভোগ শুরু ২০১৩ সালের একটি সড়ক দুর্ঘটনার পর। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাঁর ডান পায়ে স্টিলের পাত বসানো হয়েছিল। বর্তমানে সেই পাত অপসারণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই। পায়ের যন্ত্রণা এবং কাজ করতে না পারার কষ্ট নিয়ে তিনিও সহায়তার আশায় গণশুনানিতে আসেন।

চোখের ছানি অপারেশনের জন্য সহায়তা চেয়েছেন বয়োবৃদ্ধ পারুল বেগম। চিকিৎসক তাঁকে অস্ত্রোপচার ও লেন্স প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করা এই নারীর পক্ষে চিকিৎসার ব্যয় বহন করা সম্ভব হচ্ছে না।

আলসারে আক্রান্ত শয্যাশায়ী স্বামীর চিকিৎসার জন্য সহায়তা চাইতে আসেন মনোয়ারা বেগম। দুই সন্তানের পড়াশোনা, সংসারের খরচ এবং স্বামীর চিকিৎসার ব্যয় একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন তিনি। নিজের অসুস্থতা ও চিকিৎসার খরচ নিয়ে সহায়তা চেয়েছেন ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন এবং মুহাম্মদ দস্তগীর চন্দনপুরীও।

চিকিৎসার বাইরেও পারিবারিক প্রয়োজনে সহায়তা চেয়েছেন কেউ কেউ। রিকশাচালক নাজমুল হকের ছোট বোনের বিয়ে আগামী ৬ নভেম্বর। সীমিত আয়ে সংসার চালানোর পর বিয়ের খরচ জোগাড় করতে না পেরে জেলা প্রশাসকের কাছে আর্থিক সহায়তার আবেদন করেন তিনি।

গণশুনানিতে আবেদনকারীদের প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তাঁদের পারিবারিক অবস্থা, চিকিৎসার প্রয়োজন এবং আর্থিক সংকটের কথা শোনেন তিনি। পরে অসুস্থ ও অসহায় ১১ জনকে এবং বিয়ের জন্য একজনকে তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, গণশুনানিতে পাওয়া অভিযোগ ও আবেদন পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরাসরি উপস্থিত আবেদনকারীদের পাশাপাশি অনলাইনে যুক্ত প্রবাসীদের সমস্যাগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়।

অসহায় মানুষের জন্য গণশুনানি শুধু অভিযোগ জানানোর আনুষ্ঠানিকতা নয়; নিজেদের দুর্দশার কথা সরাসরি তুলে ধরারও একটি সুযোগ। ক্যান্সারের দীর্ঘ চিকিৎসা কিংবা একটি পরিবারের সব সংকট এককালীন আর্থিক সহায়তায় দূর করা সম্ভব না হলেও জরুরি সময়ে এমন সহযোগিতা অসহায় মানুষের কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে।

আবেদনকারীদের মতে, তাঁদের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং তাৎক্ষণিকভাবে পাশে দাঁড়ানোর এ উদ্যোগ মানবিক প্রশাসনিক সেবার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর