বরগুনার বেতাগী উপজেলায় সরকারি অনুদান ও অন্যান্য সুবিধা পাওয়া চারটি স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি নথিতে চার প্রতিষ্ঠানে ২০ জন শিক্ষক ও ১২০ জন শিক্ষার্থী থাকার তথ্য থাকলেও সরেজমিনে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া ৩০ জন করে শিক্ষার্থীর জন্য বই বিতরণের তথ্য থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বেতাগীর ৪৮টি ইবতেদায়ি মাদ্রাসার মধ্যে চারটি প্রতিষ্ঠান ওই দপ্তরের মাধ্যমে সরকারি অনুদান ও অন্যান্য সুবিধা পায়। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—করুণা হাসানিয়া দারুল উলুম স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, পূর্ব আয়লা চান্দখালী হাজেরিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা, উত্তর কাউনিয়া ছালেহিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা এবং জলিশারহাট দলিল উদ্দিন স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা।
নথি অনুযায়ী, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে পাঁচজন করে শিক্ষক বেতন-ভাতার আওতায় রয়েছেন। একই সঙ্গে প্রতিটি মাদ্রাসায় ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য বই বিতরণের তথ্য রয়েছে। সে হিসাবে চার প্রতিষ্ঠানে ২০ জন শিক্ষক ও ১২০ জন শিক্ষার্থী থাকার কথা।
তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনোটিতেই নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রমের স্বাভাবিক চিত্র পাওয়া যায়নি।
হোসনাবাদ ইউনিয়নের জলিশারহাট দলিল উদ্দিন স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় গিয়ে কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ ও টেবিল-চেয়ারে ধুলাবালি জমে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকরা নিয়মিত মাদ্রাসায় আসেন না এবং তারা গত কয়েক মাসে কোনো শিক্ষার্থীকে সেখানে ক্লাস করতে দেখেননি।
মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আবুল কালামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে শিক্ষক খোকন সিকদারের সঙ্গে কথা হয়েছে। এ সময় সংবাদ সংগ্রহে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য বিস্তারিতভাবে পাওয়া যায়নি।
করুণা হাসানিয়া দারুল উলুম স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসাতেও সরেজমিনে কোনো শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চ ও অন্যান্য আসবাবপত্রে ধুলাবালি জমে থাকতে দেখা যায়। পরিদর্শনের সময় কোনো শিক্ষকও উপস্থিত ছিলেন না। পরে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতির খবর পেয়ে দুই শিক্ষিকাকে মাদ্রাসায় আসতে দেখা যায়।
প্রধান শিক্ষক মো. মিজানুর রহমান জানান, তিনি একটি মিটিংয়ে অংশ নিতে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষকরা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না এবং স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে না।
উত্তর কাউনিয়া ছালেহিয়া স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় গিয়েও কোনো শিক্ষক বা শিক্ষার্থীর উপস্থিতি পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামো জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়।
প্রধান শিক্ষক মো. মাসুম বিল্লাহ জানান, তিনি ও মাদ্রাসার অন্য শিক্ষকরা একটি মিটিংয়ে অংশ নিতে ঢাকায় গেছেন। তবে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার দাবি, তাঁকে ঘটনার কিছুক্ষণ আগেও এলাকায় দেখা গেছে।
এ মাদ্রাসার জমি ও শিক্ষা কার্যক্রম নিয়েও স্থানীয়দের বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির জন্য প্রায় ২৮০ শতাংশ জমি দান করা হয়েছে। ওই জমিতে থাকা গাছ বিক্রি করে প্রায় ৪০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। অর্থটি কোথায় ও কীভাবে ব্যয় করা হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।
এ ছাড়া প্রধান শিক্ষক নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় মাদ্রাসায় নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাদের দাবি, প্রায় আড়াই বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত বন্ধ রয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের বক্তব্যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে চারটি প্রতিষ্ঠানের সরকারি নথিভুক্ত শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংখ্যা এবং সরেজমিনে পাওয়া চিত্রের মধ্যে পার্থক্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ৩০ জন শিক্ষার্থীর জন্য বই বিতরণের তথ্য থাকলেও সংশ্লিষ্ট শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত পাঠদানের দৃশ্য না পাওয়ায় বই বিতরণ ও শিক্ষার্থী উপস্থিতির তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
এ ছাড়া সরকারি বেতন-ভাতার আওতায় থাকা ২০ জন শিক্ষক নিয়মিত প্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থাকেন কি না, নথিতে থাকা ১২০ শিক্ষার্থী বাস্তবে নিয়মিত পড়াশোনা করছে কি না এবং সরকারি সুবিধার বিপরীতে শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব অবস্থা কী—এসব বিষয় নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এ বিষয়ে বেতাগী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহ. সাদ্দাম হোসেন জানান, অভিযোগগুলো তদন্ত করে দেখা হবে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের তদন্ত শেষ হলে সরকারি নথিতে থাকা শিক্ষক-শিক্ষার্থী সংখ্যা, বই বিতরণ এবং শিক্ষা কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এই বাংলা/এমএস