বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:৩৭ পূর্বাহ্ন

দৃষ্টিহীনতা নয়, জয়ের প্রেরণা-অদম্য মারুফের আলিম পরীক্ষার লড়াই

এইবাংলা অনলাইন
  • প্রকাশকালঃ শুক্রবার, ৩ জুলাই, ২০২৬

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি :

দৃষ্টিশক্তি হারিয়েও থেমে থাকেননি হাফেজ মো. মারুফ উল্যাহ। অসংখ্য বাধা, অপমান ও প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে তিনি এবার আলিম পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ফাজিল মাদরাসা কেন্দ্রে শ্রুতি লিখনের সহায়তায় পরীক্ষা দিচ্ছেন এই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। তার উত্তরপত্র লিখে দিচ্ছেন ভাতিজি মোছা. ছুম্মা আক্তার।

রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বুজরুক নূরপুর গ্রামের বাসিন্দা মারুফ উল্যাহ পরিবারের দুই ভাইয়ের মধ্যে ছোট। বাবা মো. গোলজার হোসেন ২০১৯ সালে মারা যান। মা মোছা. শাহজাদি বেগম ছেলের শিক্ষাজীবনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি আজ আলিম পরীক্ষার্থী।

মারুফ জানান, ছোটবেলায় দৃষ্টিশক্তি হারানোর পর বাড়ির পাশের একটি বিদ্যালয় থেকে তাকে পড়াশোনা করতে নিরুৎসাহিত করা হয়। এমনকি শিক্ষকরা বলেছিলেন, দৃষ্টিহীন হয়ে পড়াশোনা করে কোনো লাভ নেই। সহপাঠীদের কটূক্তি, অবহেলা ও নানা অপমানের মধ্য দিয়েও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি।

তিনি বলেন, “আমার কাছে পরীক্ষায় পাস করাই মূল লক্ষ্য ছিল না, জ্ঞান অর্জনই ছিল সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও আমি পড়াশোনা চালিয়ে গেছি।”

বাড়ির পাশের স্কুল ছেড়ে পরে একটি হাফিজিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন তিনি। এরপর এবতেদায়ি শেষ করে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সময়ও নানা ধরনের অবহেলা ও অপমানের শিকার হন।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

২০২২ সালে ফরিদপুরের একটি দাখিল মাদরাসায় নবম শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর তার জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে। সেখানে শিক্ষকদের আন্তরিক সহযোগিতা ও উৎসাহ তাকে নতুন করে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে। পরে কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদরাসায় ভর্তি হয়ে আরও এগিয়ে যান তিনি।

মারুফ বলেন, “আমার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এই বিশ্বাস—সবাই যদি পারে, আমি কেন পারব না? সেই জিদই আমাকে এতদূর নিয়ে এসেছে।”

ভবিষ্যতে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করার ইচ্ছার কথাও জানান তিনি। তার ভাষায়, “আমি চাই, আমার মতো আর কাউকে যেন পড়াশোনার জন্য অপমান সহ্য করতে না হয়। সুযোগ পেলে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষার উন্নয়নে কাজ করব।”

তিনি আরও বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কখনোই হতাশ হওয়া উচিত নয়। শিক্ষাই তাদের আত্মমর্যাদা ও সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি।

কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদরাসার মোফাচ্ছির মো. মাজিদুর রহমান বলেন, “মারুফ একজন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী শিক্ষার্থী। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও তার শেখার আগ্রহ আমাদের অনুপ্রাণিত করে। আমরা চাই, সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হোক।”

রাজারহাট ফাজিল মাদরাসার অধ্যক্ষ ও কেন্দ্র সচিব মো. আব্দুল হাই জানান, এ বছর কেন্দ্রটিতে ৩২৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী হিসেবে মারুফ শ্রুতি লিখনের সহায়তায় সুষ্ঠুভাবে আলিম পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন।

মারুফ উল্যাহর এই সংগ্রামী পথচলা প্রমাণ করে, শারীরিক সীমাবদ্ধতা নয়—দৃঢ় মনোবল, অধ্যবসায় এবং শিক্ষার প্রতি অটুট বিশ্বাসই মানুষকে সাফল্যের পথে এগিয়ে নেয়।

এই বাংলা/এমএস                                                                                                                                                                                                                                          টপিক

এই সম্পর্কিত আরো খবর