মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬, ১০:১৯ অপরাহ্ন

পোরগোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ অকৃতকার্য: দায় কি শুধুই শিক্ষকদের?

পিরোজপুর প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

পিরোজপুর সদর উপজেলার কদমতলা ইউনিয়নের পোরগোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফল প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্ন মহল থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দায়ী করে নানা মন্তব্য ও সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে। তবে সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু শিক্ষকদের ওপর দায় চাপালে বিদ্যালয়টির ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যের অন্যান্য কারণগুলো আড়ালে থেকে যেতে পারে।

সম্প্রতি সরেজমিনে বিদ্যালয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পেছনে রয়েছে জরাজীর্ণ অবকাঠামো, শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি, অভিভাবকদের অসচেতনতা এবং শিক্ষক সংকটসহ নানা সমস্যা।

বিদ্যালয়টির ভবন দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এর পাশাপাশি পুরো ক্যাম্পাসে কোনো সীমানাপ্রাচীর নেই। স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়টি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী প্রথম এক-দুটি ক্লাস করার পর শিক্ষকদের নজর এড়িয়ে বিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যায়।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো শিক্ষার্থী নিয়মিত বিদ্যালয়ে না এলে তাঁরা অভিভাবকদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তবে অনেক সময় অভিভাবকেরা ফোন ধরেন না। আবার পড়াশোনার স্বার্থে কোনো শিক্ষার্থীকে শাসন করলে কিছু অভিভাবক বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষকদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলা ও পাঠদানের পরিবেশ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে বলে দাবি শিক্ষকদের।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, একসময় শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই পড়াশোনায় বেশি সময় দিত। বর্তমানে অনেক শিক্ষার্থী বাসায়ও পড়াশোনার পর্যাপ্ত পরিবেশ ও নজরদারি পাচ্ছে না। মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে তাদের পড়াশোনায় মনোযোগ কমছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া বিদ্যালয়টিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় নিয়মিত পাঠদানও ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শিক্ষক সংকট, শিক্ষার্থী অনুপস্থিতি এবং অভিভাবকদের পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব—সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষা কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত।

তবে শিক্ষার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের দায়িত্বও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিতি নিশ্চিত করা, দুর্বল শিক্ষার্থীদের আলাদাভাবে সহায়তা করা এবং অভিভাবকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষা কার্যক্রম আরও গতিশীল করার সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষাবিদদের মতে, একটি বিদ্যালয়ের ফলাফল কেবল শিক্ষকদের প্রচেষ্টার ওপর নির্ভর করে না। এর সঙ্গে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও শিক্ষক সংকট থাকলে শিক্ষকদের একক প্রচেষ্টায় কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করাও কঠিন।

তাই পোরগোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এবারের ফল বিপর্যয়ের কারণ খুঁজতে একপাক্ষিকভাবে শিক্ষকদের দায়ী না করে প্রয়োজনীয় তদন্তের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করা জরুরি। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জরাজীর্ণ ভবন সংস্কার বা নতুন ভবন নির্মাণ, সীমানাপ্রাচীর স্থাপন, শূন্য পদে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং অভিভাবকদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার উদ্যোগ নিতে হবে।

শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, স্থানীয় জনগণ ও প্রশাসনের সম্মিলিত উদ্যোগই পারে পোরগোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করতে।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর