কিছু গল্পের শেষটা সত্যিই হৃদয়বিদারক। দীর্ঘ ১৫–১৬ বছর নিখোঁজ থাকার পর পরিবারের সন্ধান মিলেছে এক যুবকের। তবে জীবিত নয়, নিথর মরদেহ হয়ে পরিবারের কাছে ফিরেছেন তিনি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে কয়েকদিন আগে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় ঘোরাফেরা করছিলেন এক ব্যক্তি। স্থানীয়দের কাছে নিজের পরিচয় দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁর কথাবার্তা ছিল অসংলগ্ন। ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
এ সময় মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ভোলাহাটের বীরেশ্বরপুর ইসলামিক মিডিয়ার কয়েকজন যুবক। তারা ওই অসহায় ব্যক্তির চুল-দাড়ি কেটে দেন, গোসল করিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করেন এবং নতুন পোশাক পরিয়ে দেন। এ সময় তিনি নিজের সম্পর্কে কিছু তথ্যও দেন। কথাগুলো অসংলগ্ন হলেও পরবর্তীতে সেগুলোই পরিচয় শনাক্তের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে ওঠে।
দুঃখজনকভাবে গত ২৩ আগস্ট দিবাগত রাতে ভোলাহাটে ওই ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে পুলিশ তদন্ত করছে। পরে ভোলাহাট থানা পুলিশের সহযোগিতায় মরদেহটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয়।
এরপর শুরু হয় পরিচয় ও পরিবারের সন্ধানে মানবিক অনুসন্ধান। ভোলাহাটের সাংবাদিক, থানা পুলিশ, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী টিম, স্থানীয় সুধীজন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটি সিআইডি টিম পরিচয় শনাক্তে কাজ শুরু করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার পাশাপাশি টাঙ্গাইলসহ বিভিন্ন জেলার ফেসবুক গ্রুপে তাঁর ছবি ও তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রায় ৮ থেকে ১০টি থানায় যোগাযোগ করে সম্ভাব্য সূত্র যাচাই করা হয়। অবশেষে দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর সোমবার (২৪ আগস্ট) দিবাগত রাত প্রায় ১২টার দিকে মধুপুরের তাঁর বোন নাসরীনের মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত হয়।
ওই ব্যক্তির নাম মো. বাবুল হোসেন (৩৫)। তাঁর বাবা মৃত মোনশের আলী এবং মা হাদিজা বেগম। বাড়ি টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার আলোকদিয়া ইউনিয়নের উত্তর গাংগাই (কাশিনাথপাড়া) এলাকায়।
বাবুলের চাচাতো ভাই মিজানুর রহমান জানান, বাবুল দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। প্রায় ১৫–১৬ বছর আগে তিনি নিখোঁজ হন। এরপর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন তাঁকে খুঁজেছেন। কিন্তু কোনো সন্ধান পাননি।
এই দীর্ঘ সময়ে বাবুলের বাবা মারা যান। পরিবারের অন্য সদস্যরাও প্রিয় মানুষটির ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন। অবশেষে বাবুলের সন্ধান মিললেও স্বজনদের সামনে ফিরে আসে তাঁর নিথর দেহ।
একদিকে ১৫–১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান, অন্যদিকে প্রিয়জনকে জীবিত ফিরে পাওয়ার পরিবর্তে মরদেহ গ্রহণ—বাবুলের পরিবারের জন্য এটি নিঃসন্দেহে এক হৃদয়বিদারক পরিণতি।
বাবুলের পরিচয় শনাক্তে বীরেশ্বরপুর ইসলামিক মিডিয়ার সদস্যদের মানবিক উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চুল-দাড়ি কাটানো, গোসল করানো ও নতুন পোশাক পরানোর সময় বাবুল নিজের সম্পর্কে যে তথ্য দিয়েছিলেন, পরবর্তীতে সেগুলোই পরিবারের সন্ধানে কাজে আসে।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দুপুর ১২টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতাল থেকে বাবুল হোসেনের মরদেহ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দীর্ঘ ১৫–১৬ বছর পর পরিবারের কাছে ফিরলেন বাবুল—তবে জীবনের স্পন্দন নিয়ে নয়, শেষবারের মতো নিথর দেহ হয়ে।
পরিচয় শনাক্ত ও মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় সহযোগিতার জন্য ভোলাহাট থানা পুলিশ, সাংবাদিক সমাজ, বীরেশ্বরপুর ইসলামিক মিডিয়ার সদস্য, স্বেচ্ছাসেবী টিম, সিআইডি টিমসহ সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
মরহুম বাবুল হোসেনের রুহের মাগফিরাত কামনা করেছেন স্বজন ও স্থানীয়রা।
এই বাংলা/এমএস