শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

রেলের স্পেয়ার পার্টস সরবরাহে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ, ঝুলে আছে ৫৪ প্রতিষ্ঠানের আবেদন

নিজস্ব প্রতিবেদক
  • প্রকাশকালঃ শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনে ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভের স্পেয়ার পার্টস সরবরাহে নতুন প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন জমা পড়ার পর সাত দফা সময় পরিবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত আবেদনপত্র উন্মুক্ত করা হলেও এখনো যোগ্য প্রতিষ্ঠান বাছাই ও তালিকাভুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। এতে রেলের সরবরাহ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী চক্র রেলের এ সরবরাহ কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। নতুন প্রতিষ্ঠানকে বাজারে প্রবেশের সুযোগ না দিতে পরিকল্পিতভাবে প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন আবেদনকারী।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলীয় জোনের সিসিএস পাহাড়তলীতে ‘ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ স্পেয়ার পার্টস’ সরবরাহের জন্য অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানের নাম অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে ২০২৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। পাহাড়তলী স্টোরের প্রধান নিয়ন্ত্রক ফরিদ আহমেদের স্বাক্ষরে প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর দুপুর ২টা থেকে ৮ অক্টোবর দুপুর ১২টা পর্যন্ত আবেদন জমা দেওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়। একই দিন দুপুর সাড়ে ১২টায় আবেদনপত্র উন্মুক্ত করার কথা ছিল।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট ৫৪টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির জন্য আবেদন করে। তবে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কারণে কার্যক্রম সাত দফা পিছিয়ে যায়। অবশেষে ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টায় আবেদনপত্র উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আবেদনকারীদের যোগ্যতা যাচাই, তালিকাভুক্তি কিংবা পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি বলে অভিযোগ আবেদনকারীদের।

এ দীর্ঘসূত্রতার কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী চক্র নিজেদের পছন্দের কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে লোকোমোটিভের স্পেয়ার পার্টস সরবরাহের সুযোগ নিয়ন্ত্রণ করছে। নতুন প্রতিষ্ঠান এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়ার উদ্যোগ নিলেই নানা অজুহাতে তাদের পথ আটকে দেওয়া হয়। আবেদনপত্র উন্মুক্ত হওয়ার পরও সিদ্ধান্ত না আসার পেছনে ওই চক্রের প্রভাব রয়েছে বলেও দাবি তাঁদের।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, এ চক্রের সঙ্গে রেলওয়ের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। পছন্দের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে কোনো কোনো কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকটি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “কবে আমাদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হবে, তা আমরা জানি না। আমাদের অভিযোগ, অদক্ষ ও অযোগ্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহের সুযোগ তৈরি করে একটি গোষ্ঠী আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছে। আর এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত কিছু কর্মকর্তা নতুন প্রতিষ্ঠান অন্তর্ভুক্তির কার্যক্রম বছরের পর বছর আটকে রেখেছেন।”

তাঁদের অভিযোগ, পুরোনো তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নতুন কোম্পানির অন্তর্ভুক্তি ঠেকাতে চলমান আবেদনপ্রক্রিয়া বাতিল করে নতুন করে কার্যক্রম শুরুর জন্য তদবির করছেন। এতে প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে ওঠার পথ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলো রেলের সঙ্গে ব্যবসা করতে আগ্রহ হারাতে পারে বলেও মনে করছেন আবেদনকারীরা।

এ পরিস্থিতিতে রেলের ক্রয় ও সরবরাহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রেল মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, ৫৪টি প্রতিষ্ঠানের আবেদন দ্রুত যাচাই-বাছাই করে যোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সিসিএস বেলাল সরকারের ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলের পূর্বাঞ্চলীয় জোনে সরবরাহ কার্যক্রমে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও অনিয়মের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ঝুলে থাকা আবেদনগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি করা জরুরি। অন্যথায় প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মানসম্মত পণ্য সংগ্রহ ও সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর