কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামে ট্রলার চলাচলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে এক শিক্ষকের ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হামলার সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ সদস্যরা তাঁকে রক্ষায় এগিয়ে না এসে মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী শিক্ষক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন। অন্যদিকে, এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেও সুফল পাননি বলে দাবি করেছেন তাঁর ছোট ভাই ও ব্যবসায়ী মো. আলাউদ্দিন (৪৫)।
নাসির উদ্দিনের অভিযোগ, হামলার সময় অষ্টগ্রাম থানার এসআই শফিক ও তাঁর সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বারবার পুলিশের সহায়তা চাইলেও তাঁরা এগিয়ে আসেননি। বরং দাঁড়িয়ে থেকে মোবাইল ফোনে হামলার দৃশ্য ধারণ করেন। পরে লোক মারফত পুলিশের ধারণ করা ভিডিও সংগ্রহ করেন বলেও দাবি করেন তিনি।
নাসির উদ্দিন সাভিয়ানগর আবদুল আউয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিষয়ের সিনিয়র শিক্ষক।
এ বিষয়ে অষ্টগ্রাম থানার এসআই শফিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “অনেক দিন আগের ঘটনা, আমার সঠিক মনে নেই।”
অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১০ জুলাই অষ্টগ্রাম থেকে বাজিতপুরের গয়না ঘাট পর্যন্ত ট্রলার চলাচলকে কেন্দ্র করে বিরোধের জেরে নাসির উদ্দিনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনি আহত হন বলে আলাউদ্দিনের আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আলাউদ্দিনের দাবি, বিরোধের একপর্যায়ে প্রতিপক্ষের লোকজন পিস্তলসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অস্ত্র প্রদর্শন করে ভয়ভীতি সৃষ্টি করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও অস্ত্র উদ্ধার কিংবা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশের সদস্যরা অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা না নিয়ে ভিডিও ধারণে ব্যস্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ তাঁর।
এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে অষ্টগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রোকনুজ্জামানের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, অভিযোগ ও ভিডিও ফুটেজ জমা দেওয়ার পরও মামলা গ্রহণ না করা, অভিযুক্তদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং মাদক কারবারিদের সঙ্গে কথিত সখ্যতার অভিযোগ তুলেছেন আলাউদ্দিন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আলাউদ্দিন জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর অষ্টগ্রাম থানার ওসি বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন তিনি। কিন্তু তাঁর দাবি, অভিযোগ করার পরও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেও প্রতিকার না পেয়ে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন।
আলাউদ্দিনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক স্মারকের সূত্র উল্লেখ করে ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে অষ্টগ্রাম থানা থেকে একটি নোটিশ জারি করা হয়। নোটিশে অভিযোগ অনুসন্ধান ও তদন্তের স্বার্থে প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং জাতীয় পরিচয়পত্রসহ ১৭ অক্টোবর সকাল ১০টায় অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. দিদারুল ইসলামের কাছে হাজির হতে বলা হয়।
আলাউদ্দিনের দাবি, তিনি নির্ধারিত সময়ে হাজির হয়ে অভিযোগের বিস্তারিত বিবরণ ও প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করেন। তাঁর কাছে অভিযুক্তদের কথিত হুমকি, অস্ত্র প্রদর্শন ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের অডিও-ভিডিও প্রমাণ রয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত সংবাদপত্রের কাটিংসহ প্রাসঙ্গিক নথিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে এরপরও দৃশ্যমান কোনো প্রতিকার পাননি বলে অভিযোগ তাঁর।
এসব অভিযোগের বিষয়ে অষ্টগ্রাম থানার ওসি রোকনুজ্জামান দৈনিক স্বাধীন সংবাদকে বলেন, “মামলা নেয়নি কথাটা ভুল। অভিযোগে কিছু অসংগতি প্রসঙ্গ এনেছে, যা ভুল। আমি বলেছিলাম, আজ এ অভিযোগটি সংশোধন করে নিয়ে আসেন। কিন্তু তারা আর আসেনি।”
অন্যদিকে, নোটিশ ও তদন্তের বিষয়ে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মো. দিদারুল ইসলামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এই বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলছে। এখন আপাতত কোনো কিছু বলা যাচ্ছে না।”
একজন শিক্ষকের ওপর প্রকাশ্যে হামলার অভিযোগ এবং সে সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পুলিশের উপস্থিতিতে হামলা, আক্রান্ত ব্যক্তিকে সহায়তা না করা, ভিডিও ধারণ এবং পরবর্তী সময়ে অভিযোগের প্রতিকার না পাওয়ার বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
তাঁদের মতে, পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করা জরুরি। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষক নাসির উদ্দিন ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এই বাংলা/এমএস