সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

এক শিক্ষার্থী ছাড়া শ্রেণিকক্ষে কেউ নেই, অফিসকক্ষে শিক্ষকদের আড্ডা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

‘কোনো ছাত্রী আসে না। প্রতিদিন একাই আসি আর ঘুরে যাই। ক্লাসে ১১ জন ছাত্রী ভর্তি থাকলেও কেউ আসে না। বাবা-মায়ের চাপে বাধ্য হয়ে আসি। এটাকে কি মাদ্রাসা বলে?’—হতাশা ও আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিল কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার নিজাই খামার বালিকা দাখিল মাদ্রাসার ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছা. আঁখি মনি।

একই অভিযোগ অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী আশরাফীর। তার ভাষ্য, ভর্তি হয়ে তাদের জীবনটাই মাটি হয়ে গেছে।

১৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সুনসান নীরবতায় ঢাকা পুরো মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ। মাঠে হাঁটুসমান ঘাস, নেই শিক্ষার্থীদের কোলাহল। বারান্দায় ঘোরাফেরা করছিল মাত্র তিনজন ছাত্রী। ক্লাসে না থাকার কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, শিক্ষক ক্লাসে না আসায় তারা খেলাধুলা করছে। অন্যদিকে অফিসকক্ষে দেখা যায় ১২ থেকে ১৫ জন শিক্ষককে। প্রতিবেদকের উপস্থিতির সময় তারা সেখানে বসে ছিলেন।

১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মাদ্রাসায় মোট শিক্ষার্থী দেখানো হয়েছে ১৫৭ জন। এর মধ্যে ৯৬ জন উপবৃত্তি পান বলে প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে। তবে এলাকাবাসীর অভিযোগ, বাস্তবে প্রতিদিন গড়ে ১০ জন শিক্ষার্থীও উপস্থিত থাকে না। শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম থাকার পরও শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. মিজানুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ছাত্রী নেই, তবুও বছরের পর বছর এই প্রতিষ্ঠান চলছে কীভাবে? শিক্ষকরাও ঠিকমতো আসেন না। অনিয়ম তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’

দাখিল পর্যায়ে অন্তত ১০টি শ্রেণিকক্ষ থাকার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েছে মাত্র পাঁচটি কক্ষ। আরও অভিযোগ, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির ইবতেদায়ি শাখায় কোনো শ্রেণিকক্ষ বা শিক্ষার্থী না থাকলেও সেখানে চারজন শিক্ষক কয়েক বছর ধরে সরকারি বেতন-ভাতা নিচ্ছেন।

এদিকে দাখিল পরীক্ষার ফলাফল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষা পরিপত্রের নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত সংখ্যার কম শিক্ষার্থী পাস করলে প্রতিষ্ঠানটির বেতন-ভাতা স্থগিতের বিধান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। অথচ মাদ্রাসাটিতে ২০২৩ সালে পাঁচজন, ২০২৪ সালে তিনজন এবং ২০২৫ সালে চারজন শিক্ষার্থী দাখিল পরীক্ষায় পাস করেছে। পরপর তিন বছর নির্ধারিত সংখ্যার কম শিক্ষার্থী পাস করার পরও বেতন-ভাতা অব্যাহত থাকার বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির অভিভাবক সদস্য মো. আকবর আলী বলেন, ‘আইনকানুন বুঝি না, মিটিংয়ে শুধু সই দিই। এখানে তো দেখছি ছাত্রীর চেয়ে শিক্ষক বেশি।’

শিক্ষার্থী উপস্থিতি কম থাকার বিষয়টি স্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত মাদ্রাসা সুপার মো. আব্দুল গফ্ফার বলেন, ‘আমি নতুন যোগ দিয়েছি। বাল্যবিবাহের কারণে উপস্থিতি কম। হোম ভিজিট করেও ছাত্রী আনা যাচ্ছে না।’

তবে ইবতেদায়ি শাখায় শিক্ষার্থী না থাকার পরও চারজন শিক্ষক দায়িত্ব পালন ও বেতন-ভাতা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও সাবেক সুপার মোহাম্মদ আলী বলেন, বেতন-ভাতা বন্ধ করার এখতিয়ার তাঁর নেই।

উলিপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘গুরুতর এই অভিযোগের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত পরিদর্শন করা হবে।’

উলিপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ টি এম আরিফ বলেন, ‘অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। বেতন বন্ধসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর