‘বাড়িঘর, জমিজমার সঙ্গে এবার আমাদের পূর্বপুরুষের কবরটিও পদ্মা নদীর পেটে চলে গেল।’ কথাগুলো বলছিলেন মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের হরিহরদিয়া এলাকার জীবন মোল্লা।
পদ্মার তীব্র ভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমির পাশাপাশি এবার বিলীন হয়েছে জীবন মোল্লার পিতামহ মাঈন উদ্দীন মোল্লার কবরও। দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের স্মৃতি ও আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই কবরটিও এখন নদীগর্ভে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, হরিরামপুরের চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে কয়েক বছর ধরে পদ্মার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত চার-পাঁচ বছরে প্রায় দুই হাজার বসতবাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে দাবি তাদের। চলতি বর্ষায় হরিহরদিয়া, সেলিমপুর, জয়পুর ও হালুয়াঘাটসহ আশপাশের এলাকায় শতাধিক বাড়িঘর বিলীন হয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানান।
স্থানীয়দের আরও দাবি, গত কয়েক বছরে লেছড়াগঞ্জ, সুতালড়ি ও আজিমনগর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে। আজিমনগর ইউনিয়ন উচ্চ বিদ্যালয়ের চারতলা ভবন, হাতিঘাটা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারসহ বহু স্থাপনা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে তারা জানান।
হরিহরদিয়া এলাকার কিন্ডারগার্টেনের কর্ণধার রাজিব হোসেন বলেন, ‘সেলিমপুর গত বছর শেষ হয়েছে পদ্মায়। এবার বর্ষায় জয়পুরে প্রায় ১৫০টি বাড়ি নদীতে চলে গেছে। মানুষ ঘরবাড়ি সরিয়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে। যারা আগে জমিজমার মালিক ছিলেন, তাদের অনেকেরই এখন থাকার জায়গা নেই।’
তিনি আরও বলেন, লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের পাশাপাশি ফরিদপুর সদরের নর্থ চ্যানেল ইউনিয়নেও নদীভাঙন শুরু হয়েছে।
হালুয়াঘাট এলাকার বাসিন্দা ও ভাড়ায় মোটরসাইকেল চালক ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমাদের ঘরবাড়ি ও জমি কয়েক বছর আগে নদীতে গেছে। এখন আবার হালুয়াঘাট এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। হড়িনা ঘাট এলাকাতেও ভাঙন রয়েছে। চরাঞ্চলে ভাঙন ঠেকাতে তেমন কোনো কাজ হচ্ছে না।’
লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ওয়ার্ড সদস্য মোতালেব হোসেন বলেন, ‘লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নেই সবচেয়ে বেশি ভাঙন হচ্ছে। দ্রুত বালুভর্তি জিওব্যাগ না ফেললে চর টিকবে না। ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছিল বলে জানি। কিন্তু এখনো কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।’
লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘চরের মানুষ অসহায়। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নসহ চরাঞ্চল পদ্মার ভাঙনে প্রায় শেষ হয়ে গেছে। ভাঙন ঠেকাতে কার্যকর কোনো কাজ নেওয়া হচ্ছে না। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন, নটাখোলা পুলিশ ফাঁড়ি ও নটাখোলা আফরোজা উচ্চ বিদ্যালয়ও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে গুরুত্বপূর্ণ এসব স্থাপনাও নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।’
আন্ধারমানিক ঘাট থেকে লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নে চলাচলকারী ট্রলারের চালক ফরিদ হোসেন বলেন, ‘সেলিমপুর গত বর্ষায় শেষ হয়েছে। এ বর্ষায় জয়পুরও শেষের পথে। হালুয়াঘাট, হরিনা ঘাট ও আজিমনগর ইউনিয়নেও ভাঙন হচ্ছে। এভাবে ভাঙতে থাকলে চর আর থাকবে না।’
স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছর ধরে ভাঙন অব্যাহত থাকলেও নদীতীর রক্ষায় স্থায়ী বা অস্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। এতে বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে অনেক পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ছে।
হরিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, ‘আমি এক সপ্তাহ হলো এ উপজেলায় যোগদান করেছি। লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নদীভাঙনের বিষয়টি আমাকে জানিয়েছেন। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে ভাঙনকবলিত এলাকা পরিদর্শনে যাব।’
মানিকগঞ্জ পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান বলেন, ‘আজ সোমবার মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঈনুল ইসলাম খান, উপজেলা প্রশাসনসহ চরাঞ্চলের লেছড়াগঞ্জ ইউনিয়নের ভাঙনকবলিত এলাকা ফিজিবিলিটি স্টাডির জন্য পরিদর্শনে যাচ্ছি। পরিদর্শন শেষে বিস্তারিত জানাতে পারব।’
এই বাংলা/এমএস