মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন কানুনগো হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন শ্রীপদ দেব। তাঁর পদোন্নতি ও একই শাখায় পুনরায় পদায়ন, সম্পদের উৎস এবং অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। এসব বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
শ্রীপদ দেব মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার সদর ইউনিয়নের মাঝেরগাঁও গ্রামের ঠাকুর চাঁদ দেবের ছেলে। তিনি দীর্ঘদিন ভূমি অফিসে কানুনগো পদে কর্মরত ছিলেন। শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনের পর সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় কানুনগো হিসেবে কাজ করেন। পরে পদোন্নতি পেয়ে একই শাখায় অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, শ্রীমঙ্গলে শ্রীপদ দেবের একটি বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে, যার নির্মাণে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। তাঁদের দাবি, শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার ও সিলেট শহরে তাঁর নামে বা বেনামে একাধিক জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে। ভারতের কলকাতায়ও তাঁর সম্পত্তি থাকার অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
তবে এসব সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, পরিমাণ, ক্রয়মূল্য ও অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো দলিল বা নির্ভরযোগ্য নথি প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। বিদেশে সম্পত্তি থাকার অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুসন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা।
স্থানীয় কয়েকজন ও তাঁর সাবেক সহকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে শ্রীপদ দেবের সঙ্গে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী আব্দুস শহীদ এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বানু লাল রায়ের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিভিন্ন প্রকল্পের তদবির ও ভূমি-সংক্রান্ত কাজে প্রভাব বিস্তার করতেন।
এ ছাড়া শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে ভূমি-সংক্রান্ত সেবা, প্রকল্পের তদবির ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ঘিরে অনিয়ম এবং আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও করেছেন তাঁর কয়েকজন সাবেক সহকর্মী ও স্থানীয় বাসিন্দা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট ঘটনা, নথি বা আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তাঁর কর্মস্থল ও পদোন্নতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাঁদের দাবি, সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় পাঁচ বছরের বেশি সময় কানুনগো হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর পদোন্নতি পেয়ে একই শাখায় অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন একই শাখায় দায়িত্ব পালন এবং পদোন্নতির পরও একই কর্মস্থলে পদায়নের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিবিধান, জ্যেষ্ঠতা ও প্রশাসনিক নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
এদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় শ্রীপদ দেবের বিরুদ্ধে একাধিক মামলায় আসামি থাকার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তাঁদের দাবি, আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা ও ছাত্র হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে তাঁর নাম রয়েছে। তবে মামলাগুলোর নম্বর, এজাহারের অনুলিপি এবং আদালতের সর্বশেষ অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট থানার মামলা-সংক্রান্ত নথি ও আদালতের তথ্য পর্যালোচনা প্রয়োজন।
অভিযুক্ত শ্রীপদ দেবের বক্তব্য জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
সচেতন মহলের দাবি, শ্রীপদ দেবের পদোন্নতি ও পদায়নের প্রক্রিয়া, সম্পদের উৎস, মামলা-সংক্রান্ত তথ্য এবং দায়িত্ব পালনকালে ওঠা অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হোক। এ বিষয়ে সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।
এই বাংলা/এমএস