বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

বদরগঞ্জ-মিঠাপুকুরে সার বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ, নথিতে গরমিল

মিঠাপুকুর (রংপুর) প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

রংপুরের বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার তিনটি সার ডিলার পয়েন্টে সার বিক্রি ও বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও বিক্রয় মেমো ও রেজিস্টারের হিসাবে গরমিল, কোথাও খুচরা বিক্রেতার কাছে সার সরবরাহ, আবার কোথাও নিয়মিত বিক্রয়কেন্দ্র না খোলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সরেজমিনে নথিপত্র যাচাই ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে এসব অসংগতি সামনে এসেছে। বদরগঞ্জের একটি ডিলার পয়েন্টে এক দিনের ইউরিয়া বিক্রির হিসাবে ৩৪ বস্তার পার্থক্য পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় লোহানী পাড়া ইউনিয়নের একটি সার ডিলার প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।

মেমো ও রেজিস্টারে ৩৪ বস্তার গরমিল

বদরগঞ্জ উপজেলার ১৫ নম্বর লোহানী পাড়া ইউনিয়নের মণ্ডলের হাটে মেসার্স শান্তি সার বিতানের ১৯ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের বিক্রয় মেমোতে ৩১ বস্তা ইউরিয়া বিক্রির তথ্য রয়েছে। অথচ একই দিনের সেল রেজিস্টার ও স্টক রেজিস্টারে বিক্রির পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৬৫ বস্তা। ফলে ৩৪ বস্তা ইউরিয়ার হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ছয় বস্তা ইউরিয়া সরবরাহের একটি মেমোতে থাকা নম্বরে যোগাযোগ করা হলে সুজন নামের এক ব্যক্তি জানান, তাঁর সুজন ট্রেডার্স নামে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তিনি কীটনাশকের পাশাপাশি সার বিক্রি করেন এবং ওই ডিলারসহ বিভিন্ন ডিলারের কাছ থেকে সার সংগ্রহ করেন।

অন্য একটি মেমোতে থাকা নম্বরে যোগাযোগ করলে মেরাজ নামের এক ব্যক্তি দাবি করেন, তিনি কোনো সার নেননি। তাঁর নাম ব্যবহার করে কে সার নিয়েছেন, সে বিষয়েও তিনি কিছু জানেন না বলে জানান।

মেসার্স শান্তি সার বিতানের ব্যবস্থাপক সন্দীপ বাবু বলেন, হিসাবের পার্থক্যে থাকা ৩৪ বস্তা ইউরিয়া মেমো ছাড়াই বিক্রি করা হয়েছে। কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ও নির্দেশনায় খুচরা বিক্রেতাদের সার দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন তিনি। তবে হিসাবের এই অসংগতির বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

প্রতিষ্ঠানটির মালিক সুবোধ কুমার কুন্ডু (গোবিন্দ) অভিযোগের বিস্তারিত জবাব না দিয়ে ঘটনাটিকে ভুলবশত হয়েছে বলে বিবেচনা করে বিষয়টি আর না বাড়ানোর অনুরোধ জানান।

খুচরা বিক্রেতার কাছে সার পাঠানোর অভিযোগ

বদরগঞ্জের শ্যামপুর ইউনিয়নের বিএডিসি সার ডিলার মেসার্স শ্যামপুর সার ঘর, যার স্বত্বাধিকারী হাবিবা বেগম, সেখান থেকেও সম্প্রতি ১০ বস্তা ইউরিয়াসহ একটি ভ্যান আটক করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, সারগুলো কৃষকদের পরিবর্তে খুচরা বিক্রেতার কাছে পাঠানো হচ্ছিল।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক রেজাউল ফোনে দাবি করেন, সার কৃষকের কাছে পাঠানো হয়েছিল। তবে মেমোতে থাকা নম্বরে যোগাযোগ এবং ভ্যানচালকের বক্তব্যে সার খুচরা দোকানে পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়।

ডিলার পয়েন্টের মেমো ও রেজিস্টার যাচাই করে বিক্রির পরিমাণে একাধিক অসংগতি দেখা গেছে বলে জানা যায়। এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে ব্যবস্থাপক রেজাউল কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তার যোগসাজশের অভিযোগ তোলেন। তবে তাঁর এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

লোহানী পাড়া ইউনিয়নের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা জিয়া বলেন, খুচরা বিক্রেতার কাছে সার বিক্রির অনুমতি দেওয়া হয়নি। মেমো ছাড়া এক কেজি সার বিক্রিরও নিয়ম নেই। অনিয়ম হয়ে থাকলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শ্যামপুর ইউনিয়নের কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, নীতিমালার বাইরে সার বিক্রি বা অনিয়ম করার সুযোগ নেই। তবে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।

বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সেলিনা আফরোজ বলেন, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত চার সদস্যের তদন্ত দলের সঙ্গে সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। এ সময় লোহানী পাড়া ইউনিয়নের বিসিআইসি সার ডিলার পয়েন্টে অনিয়মের সত্যতা পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

পাঁচ দিনেও খোলেনি মিঠাপুকুরের ডিলার পয়েন্ট

মিঠাপুকুর উপজেলার ছড়ান ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার কামরুজ্জামান ট্রেডার্সের বিরুদ্ধেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির মালিক কামরুজ্জামান স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি আত্মগোপনে থাকায় খলিলুর রহমান নামের এক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছেন।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি সপ্তাহে দুই থেকে তিন দিন খোলা থাকে। সরেজমিনে টানা পাঁচ দিন গিয়ে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ পাওয়া যায়। ষষ্ঠ দিনেও বন্ধ থাকায় কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের পর সেটি খোলা হয়।

পরিদর্শনের সময় প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক সেল রেজিস্টার দেখাতে পারেননি। মেমো ও স্টক রেজিস্টারেও অসংগতি দেখা যায়। এ ছাড়া গুদামে সার রাখার জন্য মেঝের ওপর মাচার ব্যবস্থাও ছিল না বলে সরেজমিনে দেখা গেছে।

সাংবাদিকদের কাগজপত্র দেখার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনাকারী খলিলুর রহমান বলেন, “আপনাদের কাছে সঠিক তথ্য থাকলে নিউজ করেন, আমি দেখে নিবো আপনাদেরকে।” বক্তব্যটি সাংবাদিকদের প্রতি হুমকিসূচক বলে প্রতীয়মান হয়। স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, খলিলুর রহমান মিঠাপুকুর বণিক সমিতির সভাপতি এবং বিএডিসি সার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত।

মিঠাপুকুরের সংশ্লিষ্ট কৃষি উপসহকারী কর্মকর্তা বলেন, তিনি সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ডিলার পয়েন্টে অবস্থান করেন। মেমো ও রেজিস্টারের অসংগতির জন্য তিনি ব্যবস্থাপককে দায়ী করেন।

মিঠাপুকুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান হেকিম বলেন, খলিলুর রহমানকে সাংবাদিকদের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে বলেছেন তিনি। খুচরা বিক্রেতাদের কাছে তিন থেকে চার বস্তা সার দেওয়ার নিয়ম রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা তারিখ উল্লেখ করতে পারেননি। মেমো ছাড়া সার বিক্রি এবং রেজিস্টারের হিসাব সংরক্ষণে অনিয়মের সুযোগ নেই বলেও জানান তিনি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা।

খুচরা দোকানে মজুত সার নিয়েও প্রশ্ন

বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার অধিকাংশ খুচরা সার বিক্রেতার দোকানে বিপুল পরিমাণ সার মজুত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব সারের উৎস, ডিলারদের কাছ থেকে সরবরাহের পরিমাণ এবং বিক্রয়সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করা হলে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সারের বিতরণব্যবস্থা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

এ ক্ষেত্রে ২০২৬ সালের ২৫ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয়ের জারি করা পরিপত্রের আলোকে অনুমোদিত খুচরা বিক্রেতা ও সার বিতরণসংক্রান্ত নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি। ডিলার পয়েন্টগুলোর নথিপত্রে অসংগতি, খুচরা বিক্রেতাদের দোকানে সার মজুত এবং সরবরাহের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্তের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য বরাদ্দ সার যথাযথভাবে বিতরণ হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হতে পারে।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর