বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬

পরিবেশ রক্ষায় চট্টগ্রাম প্রশাসনের উদ্যোগ, সরকারি অর্থ ছাড়াই এক দিনে এক লাখ চারা রোপণের দাবি

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ বুধবার, ২৮ অক্টোবর, ২০২৬

এক দিনে এক লাখ গাছ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার উদ্যোগে মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) জেলার ১৬টি উপজেলা ও মহানগর এলাকায় প্রায় ১৫ হাজার মানুষের অংশগ্রহণে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সেনাবাহিনী, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, বেসরকারি সংস্থা ও স্বেচ্ছাসেবীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়।

চট্টগ্রামের এ উদ্যোগকে সারা দেশের জন্য অনুসরণীয় বলে উল্লেখ করেছেন জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। একই ধরনের কর্মসূচি গ্রহণের জন্য তিনি অন্য জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের প্রতি আহ্বান জানান।

‘এক দিনে লক্ষ বৃক্ষ, সবুজ পরিবেশ আমাদের লক্ষ্য’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত কর্মসূচির উদ্বোধন হয় সকালে নগরের জমিয়াতুল ফালাহ মসজিদ প্রাঙ্গণে নারকেলের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে। দিনভর নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় চলে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রম। সন্ধ্যায় সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটসংলগ্ন ডিসি পার্কে র‍্যালি শেষে উপদেষ্টার হাতে এক লাখতম চারা হিসেবে নারকেলের চারা রোপণের মধ্য দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন সময়ে নানা দাবি নিয়ে আন্দোলন করি। কিন্তু আজ আমাদের এই ১৫ হাজার মানুষের আন্দোলন ছিল পরিবেশ রক্ষার আন্দোলন। এই আন্দোলন আমাদের বেঁচে থাকার আন্দোলন, আমাদের আগামী প্রজন্মের বেঁচে থাকার আন্দোলন।’

সরকারি অর্থ ছাড়াই সংগ্রহ এক লাখ চারা

সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ কর্মসূচি হাতে নেয় জেলা প্রশাসন। এক দিনে বিপুলসংখ্যক চারা সংগ্রহ, নির্ধারিত এলাকায় পৌঁছে দেওয়া এবং রোপণের জন্য গর্ত প্রস্তুত করাকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন জেলা প্রশাসক।

তিনি জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, সেনাবাহিনী, বন বিভাগ ও বেসরকারি সংস্থার সহযোগিতায় কর্মসূচির প্রস্তুতি নেওয়া হয়। কর্মসূচির আগের দিন সন্ধ্যার মধ্যেই চারা রোপণের জন্য প্রয়োজনীয় গর্ত খোঁড়ার কাজ শেষ করা হয়েছিল।

জেলা প্রশাসকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন থেকে ৪০ হাজার চারা সরবরাহ করা হয়। বেসরকারি সংস্থার পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগেও বাকি চারা সংগ্রহ করা হয়। সরকারের কোনো অর্থ ব্যয় ছাড়াই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

উপকূল উপযোগী প্রজাতি নির্বাচন, পরিচর্যায় গুরুত্ব

বৃক্ষরোপণের পাশাপাশি চারাগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছে জেলা প্রশাসন। স্থানীয় পরিবেশ ও চারার টিকে থাকার সম্ভাবনা বিবেচনায় প্রজাতি নির্বাচন করা হয়েছে। উপকূলীয় পরিবেশের উপযোগী হওয়ায় সন্দ্বীপে প্রায় এক হাজার নারকেলগাছ রোপণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আনোয়ারায় নেওয়া হয়েছে ২০ হাজার গাছ রোপণের উদ্যোগ।

জেলা প্রশাসক বলেন, ‘গাছ লাগালাম, কিন্তু সেগুলো বেঁচে থাকল না—তাহলে আমাদের সমস্ত উদ্যোগ নিষ্ফল হয়ে যাবে।’

তিনি জানান, চারার সুরক্ষায় বেড়া দেওয়া এবং বিভিন্ন পর্যায়ে তদারকি কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, গ্রাম পুলিশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের সম্পৃক্ত করে বন বিভাগের কারিগরি সহায়তায় পরিচর্যা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। কোনো চারা মারা গেলে বা দুর্বল হয়ে পড়লে তা প্রতিস্থাপনের জন্য অতিরিক্ত ১০ থেকে ২০ হাজার চারা মজুত রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান উপদেষ্টার

প্রধান অতিথির বক্তব্যে জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, ‘আজকের এই অনুষ্ঠানে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসন যে কাজটি করল, যে অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প হাতে নিল, আমি মনে করি, এই ধারা যদি আমরা সারা দেশে অনুসরণ করি, তাহলে অচিরেই আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আরও এগিয়ে যেতে পারব।’

এ উদ্যোগের জন্য বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ রোপণের লক্ষ্য সম্মিলিত উদ্যোগ ও জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব। তবে বৃক্ষরোপণকে শুধু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে গাছের পরিচর্যা ও সংরক্ষণে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

চট্টগ্রামে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের ঝুঁকি মোকাবিলায় আগাম প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানান উপদেষ্টা। তাঁর মতে, দুর্যোগ ঘটে যাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে আগেই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে জানমাল রক্ষায় স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।

উন্নয়ন যেন পরিবেশের জন্য হুমকি না হয়

নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান গাছ সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, মানুষের প্রয়োজনে উন্নয়নমূলক কাজ চলবে। তবে সেই উন্নয়ন যেন আগামী প্রজন্মের জন্য পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি না করে, তা নিশ্চিত করতে হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দীন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ ও সাঈদ আল নোমান, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ডা. শাহাদাত হোসেন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরী, সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী, সেনাবাহিনীর প্রতিনিধি কর্নেল খলিল উল্লাহ, সিডিএ চেয়ারম্যান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন এবং জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।

কর্মসূচিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধি, রোভার স্কাউট, গার্লস গাইড, রেড ক্রিসেন্টের সদস্য ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।

উল্লেখ্য, এর আগে নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক থাকাকালে মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম দুই মাসে এক লাখ গাছ রোপণের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেন। ২০২৫ সালের ১০ মে শুরু হওয়া ওই কর্মসূচি শেষ হয় ১০ জুলাই সাইনবোর্ড এলাকার সড়কদ্বীপে এক লাখতম গাছ হিসেবে কৃষ্ণচূড়ার চারা রোপণের মধ্য দিয়ে। চট্টগ্রামে এক দিনেই এক লাখ গাছ রোপণের উদ্যোগের মাধ্যমে বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করল জেলা প্রশাসন।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর