ঢাকায় নিখোঁজের ২১ দিন পর নীলফামারীর ডিমলা থেকে রাকিব ইসলাম (১৭) নামে এক কিশোরের মাটিচাপা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তাকে ঢাকায় হত্যার পর মরদেহ কার্টনে ভরে ডিমলায় এনে মাটিচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আব্দুল্লাহ মামুন নামে এক যুবকের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় রাকিবকে জীবিত দেখিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠানো এবং মুক্তিপণ দাবি করার অভিযোগও উঠেছে। মামুনকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বিকেলে ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ছাতনাই বালাপাড়া গ্রামের বসুনিয়াপাড়া এলাকা থেকে রাকিবের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত রাকিব ইসলাম টাঙ্গাইলের গোপালপুর থানার হামনগর ইউনিয়নের উদ্যমপুর গ্রামের খাদেমুল ইসলামের দ্বিতীয় ছেলে।
নিহতের ভাই জহুরুল ইসলাম জীবন জানান, রাকিবকে জীবিত ফেরত দেওয়ার কথা বলে আব্দুল্লাহ মামুন তাদের কাছে কয়েক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেন। ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় পরিবার চার লাখ টাকা দেয়। তবে এরপরও রাকিবকে ফেরত দেওয়া হয়নি। পরে বিষয়টি জানিয়ে ঢাকার সংশ্লিষ্ট থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার।
পুলিশ তদন্তের একপর্যায়ে গত ৩ অক্টোবর ঢাকায় অভিযান চালিয়ে আব্দুল্লাহ মামুনকে গ্রেপ্তার করে বলে জানা গেছে। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে রাকিবকে হত্যার বিষয়টি সামনে আসে। মামুনকে গ্রেপ্তারের পর রাকিবের পরিবার ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা করে। মামলাটির ডিএমপি মামলা নম্বর-০৫, তারিখ ৫ অক্টোবর ২০২৬।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামুনকে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের ছাতনাই বালাপাড়া গ্রামে নেওয়া হয়। তার দেখানো স্থান অনুযায়ী রাকিবের মরদেহ মাটিচাপা দেওয়ার স্থান শনাক্ত করা হয়। পরে আদালতের নির্দেশে মঙ্গলবার বিকেল ৪টার দিকে ওই স্থান থেকে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ নীলফামারী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার শুক্রাবাদে রাকিবের সঙ্গে আব্দুল্লাহ মামুনের পরিচয় হয়। পরে তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় ঢাকার একটি কক্ষে দুজনের মধ্যে বিরোধের একপর্যায়ে রাকিবকে হত্যা করা হয় বলে পুলিশকে জানিয়েছেন তিনি।
মামুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হত্যার পর রাকিবের মরদেহ একটি কার্টনে ভরে বাসা থেকে বের হন তিনি। পরে ঢাকার কল্যাণপুর থেকে রংপুরগামী একটি গাড়িতে ওঠেন। যাত্রাপথে কার্টনের ভেতরে কী আছে জানতে চাইলে সেখানে ইলিশ মাছ রয়েছে বলে জানান তিনি। রংপুরে পৌঁছে লোকাল বাসে করে ডিমলায় যান মামুন। পরে মরদেহটি নিজ বাড়িতে নিয়ে বসতবাড়ির দক্ষিণ পাশে সুপারি বাগানে কার্টনসহ মাটিচাপা দিয়ে রাখেন বলে তার দেওয়া তথ্যে জানা গেছে।
এ ঘটনায় রতন (২৬) ও নুর জামাল (২৫) নামে আরও দুই ব্যক্তির সম্পৃক্ততার কথা মামুন জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে ওই দুই ব্যক্তির সম্পৃক্ততা কী পর্যায়ে এবং তারা কীভাবে ঘটনায় জড়িত—তা এখনো তদন্তাধীন।
এদিকে, এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে রাকিবকে জীবিত দেখিয়ে ভিডিও তৈরি করে পরিবারের কাছে পাঠানো এবং সেই ভিডিও দেখিয়ে মুক্তিপণ দাবির অভিযোগও রয়েছে। পরিবারের দাবি, ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় তারা চার লাখ টাকা দিলেও শেষ পর্যন্ত রাকিবকে জীবিত ফিরে পাননি।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, মুক্তিপণের অর্থ লেনদেন, এআই প্রযুক্তিতে ভিডিও তৈরির বিষয়টি এবং রতন ও নুর জামালসহ অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
ডিমলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আশরাফুল ইসলাম বলেন, অপহরণ ও হত্যা বিষয়ে ঢাকার কাফরুল থানায় মামলা হয়েছে। মামলার আসামিকে গ্রেপ্তারের পর মরদেহ উদ্ধারে সহযোগিতার জন্য তাকে ডিমলা থানায় আনা হয়। ডিমলা থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধারে সহযোগিতা করেছে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য নীলফামারী সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
এই বাংলা/এমএস