রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

জনবল-যন্ত্রাংশ সংকটে পাহাড়তলী ডিজেল শপ, তবু ১৯ লোকোমোটিভ পুনরায় সচল

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬

পূর্বাঞ্চলের রেল যোগাযোগ সচল রাখতে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছে চট্টগ্রামের পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানা। তবে গুরুত্বপূর্ণ এ কারিগরি কেন্দ্রটি বর্তমানে জনবল সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের ঘাটতি, বাজেট স্বল্পতা এবং এলসি জটিলতায় অনেকটা নাজুক অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

কারখানাটিতে ৩৩০টি পদ মঞ্জুর করা থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ১১০ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত জনবলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দিয়েই শত শত লোকোমোটিভের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

কারখানা-সংশ্লিষ্টরা জানান, দীর্ঘদিন নতুন নিয়োগ না হওয়া এবং অভিজ্ঞ টেকনিশিয়ানদের অবসরের কারণে দক্ষ জনবলের সংকট দিন দিন আরও তীব্র হচ্ছে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলে প্রতিদিন যাত্রী ও মালবাহী ট্রেন পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক লোকোমোটিভ সচল রাখা প্রয়োজন। ফলে অল্পসংখ্যক মেকানিক ও টেকনিশিয়ানকে অতিরিক্ত চাপ নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

এক ইঞ্জিন সচল রাখতে অন্যটির যন্ত্রাংশ

জনবল সংকটের পাশাপাশি কারখানাটিতে দেখা দিয়েছে যন্ত্রাংশের সংকটও। পূর্বাঞ্চলের অনেক মিটারগেজ লোকোমোটিভ পুরোনো হওয়ায় নিয়মিত বিভিন্ন যন্ত্রাংশ পরিবর্তন ও সংস্কারের প্রয়োজন হয়। এসব যন্ত্রাংশের বড় একটি অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ডলার সংকট, ব্যাংকে এলসি খোলার জটিলতা, বাজেট বরাদ্দে দীর্ঘসূত্রতা এবং সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপের কারণে প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস সময়মতো কারখানায় পৌঁছায় না।

কোনো কোনো ক্ষেত্রে রিকুইজিশন দেওয়ার পর প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ হাতে পেতে এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যায় বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

এ অবস্থায় অচল কিংবা পুরোনো লোকোমোটিভ থেকে সচল যন্ত্রাংশ খুলে অন্য ইঞ্জিনে ব্যবহার করে কাজ চালানোর ঘটনাও ঘটছে। কারিগরি কর্মীদের ভাষায়, ‘এক ইঞ্জিনের জীবন বাঁচাতে আরেকটি ইঞ্জিনের পার্টস ব্যবহার করতে হচ্ছে।’

তবে এভাবে সাময়িকভাবে একটি লোকোমোটিভ সচল করা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি স্থায়ী সমাধান নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‘কুইক ফিক্স’ করে লাইনে, আবার কারখানায়

ইয়ার্ড বা রেললাইন থেকে কোনো লোকোমোটিভ বিকল হয়ে পাহাড়তলী ডিজেল শপে এলে দ্রুত মেরামত করে সেটিকে লাইনে ফেরানোর চাপ থাকে। কিন্তু প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ ও দক্ষ জনবল না থাকায় অনেক সময় নির্ধারিত গভীর সংস্কার বা ওভারহোলিং করা সম্ভব হয় না।

তখন সাময়িক মেরামতের মাধ্যমে, কারিগরি ভাষায় যাকে ‘কুইক ফিক্স’ বলা হয়, ইঞ্জিনটি আবার লাইনে পাঠানো হয়। এর ফলে কোনো কোনো লোকোমোটিভ কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর একই ধরনের ত্রুটি নিয়ে ফের কারখানায় ফিরে আসে। রেলওয়ের কারিগরি ভাষায় এ ধরনের ঘটনাকে বলা হয় ‘রিপিট ফেইলিওর’।

অর্থাৎ বিকল হওয়া, কারখানায় আসা, দ্রুত মেরামত, লাইনে ফিরে যাওয়া এবং আবার বিকল হয়ে কারখানায় আসার একটি চক্র তৈরি হচ্ছে।

একটি লোকোমোটিভ বারবার বিকল হলে শুধু সেই ইঞ্জিনটিই অচল থাকে না, ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রস্তুত লোকোমোটিভের সংখ্যাও কমে যায়। এতে অন্য ইঞ্জিনগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়।

সংকটের মধ্যেও ১৯ লোকোমোটিভ পুনর্জীবিত

নানা সংকটের মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের কারিগরি সক্ষমতার প্রমাণ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুটি মৃতপ্রায় লোকোমোটিভ মেরামত করে সম্পূর্ণ সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে পাঠানো হয়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে চারটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আরও চারটি মৃতপ্রায় লোকোমোটিভ মেরামত করা হয়।

এ ছাড়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পাঁচটি মৃতপ্রায় ও দুটি দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে চার অর্থবছরে ১৫টি মৃতপ্রায় ও চারটি দুর্ঘটনাকবলিত—মোট ১৯টি লোকোমোটিভ মেরামতের মাধ্যমে সম্পূর্ণ সচল করে রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ঈদের আগে বাড়ে কাজের চাপ

কারখানা সূত্র জানায়, গত তিন-চার বছরে এখানকার মেকানিকরা প্রতিদিন গড়ে সাত থেকে আটটি লোকোমোটিভের ছোট-বড় মেরামত ও লাইট ওভারহোলিংয়ের কাজ করেছেন।

ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার আগে যাত্রীবাহী ট্রেনের সংখ্যা ও চাপ বেড়ে যাওয়ায় কারখানাটিতেও কাজের চাপ কয়েক গুণ বাড়ে। প্রতিটি ঈদের আগে একসঙ্গে প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫টি লোকোমোটিভ প্রস্তুত করে লাইনে আউট-টার্ন দেওয়ার কাজ করতে হয়েছে।

অর্থাৎ সীমিত জনবল ও যন্ত্রাংশের মধ্যেও পূর্বাঞ্চলের রেল বহর সচল রাখার বড় দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে পাহাড়তলী ডিজেল শপকে।

মেরামতে এসেছে ২২টি আধুনিক হুন্দাই লোকোমোটিভও

শুধু পুরোনো মিটারগেজ লোকোমোটিভ নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম থেকে আমদানি করা ৩০০০ সিরিজের ২২টি আধুনিক লোকোমোটিভও বিভিন্ন সময়ে কারিগরি ত্রুটির কারণে পাহাড়তলী ডিজেল শপে মেরামত করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

এতে আধুনিক লোকোমোটিভের ক্ষেত্রেও দক্ষ মেকানিক, উন্নত ডায়াগনস্টিক ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় স্পেয়ার পার্টস নিশ্চিত করার গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

দেশীয় প্রযুক্তিতে বাড়ছে কারিগরি সক্ষমতা

সংকটের মধ্যেও কারখানাটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে স্থাপন করা হয়েছে দুটি আধুনিক অটোমেশন মেশিন।

এর একটি স্বয়ংক্রিয় ডায়াগনস্টিকস মেশিন। এর মাধ্যমে লোকোমোটিভের জটিল ইলেকট্রিক্যাল ও ফুয়েল সিস্টেমের ত্রুটি দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে।

অন্যদিকে পার্টস ক্লিনিং ও ফিটিং অটোমেশন মেশিনের মাধ্যমে সিলিন্ডার হেড, ক্র্যাঙ্কশ্যাফ্টসহ ভারী যন্ত্রাংশ তুলনামূলক দ্রুত ও নিখুঁতভাবে পরিষ্কার ও ফিটিং করা যাচ্ছে।

এ ছাড়া মূল্যবান কর্মঘণ্টা সাশ্রয় এবং মেরামত করা যন্ত্রাংশের কার্যক্ষমতা যাচাইয়ের জন্য দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ও স্থাপন করা হয়েছে Jib Crane, AC Motor Testing Plant এবং Compressor Testing Plant।

প্রযুক্তি থাকলেও ঘাটতি জনবল ও যন্ত্রাংশে

আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হলেও কারখানাটির মূল সংকট এখনো কাটেনি। ডায়াগনস্টিক মেশিন ত্রুটি শনাক্ত করতে সক্ষম হলেও ত্রুটিপূর্ণ অংশ পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস না থাকলে মেরামতের কাজ শেষ করা সম্ভব হয় না। একইভাবে দক্ষ জনবল ছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির পূর্ণ সুফলও পাওয়া সম্ভব নয়।

পাহাড়তলী ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ মেরামত কারখানার কর্মব্যবস্থাপক (ডিজেল) প্রকৌশলী এতেশাম মো. শফিক বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে কারখানায় দক্ষ জনবল ও মানসম্মত স্পেয়ার পার্টসের ঘাটতি থাকায় মেরামত কাজ করা অনেকটাই চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। তবে দক্ষ জনবল ঘাটতি মোকাবিলা এবং মূল্যবান কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন ধরনের অটোমেশন প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বাড়ানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক উৎস থেকে পাওয়া প্ল্যান্টস অ্যান্ড মেশিনারিজের পাশাপাশি দেশীয় প্রযুক্তিতে ডায়াগনস্টিক প্ল্যান্টও স্থাপন করা হচ্ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।”

তিনি আরও বলেন, “সরঞ্জাম বিভাগ যদি বাজেট ও এলসি জটিলতা কাটিয়ে আমদানিকৃত মালামালের দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে কারখানার কাজের গতি ও লোকোমোটিভ সচল করার হার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে।”

দ্রুত নিয়োগ ও জেনুইন পার্টস চান সংশ্লিষ্টরা

কারখানা-সংশ্লিষ্টদের মতে, পাহাড়তলী ডিজেল শপের বর্তমান সংকট দূর করতে শুধু নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপন যথেষ্ট নয়। মঞ্জুরিকৃত শূন্য পদগুলোতে দ্রুত দক্ষ জনবল নিয়োগ, অভিজ্ঞ মেকানিকদের জ্ঞান নতুন কর্মীদের মধ্যে স্থানান্তর, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ, সময়মতো বাজেট বরাদ্দ এবং জেনুইন স্পেয়ার পার্টস আমদানিতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

কারণ একটি লোকোমোটিভের নির্ভরযোগ্যতা শুধু একটি ইঞ্জিনের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এর সঙ্গে ট্রেনের সময়সূচি, যাত্রীসেবা এবং সামগ্রিক রেল যোগাযোগব্যবস্থা জড়িত।

সীমিত জনবল ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পাহাড়তলী ডিজেল শপের কর্মীরা প্রতিদিন এই চাপ সামাল দিচ্ছেন। গত চার অর্থবছরে ১৯টি মৃতপ্রায় ও দুর্ঘটনাকবলিত লোকোমোটিভ মেরামত করে সচল অবস্থায় রানিং ডিভিশনে ফেরত পাঠানো এবং দেশীয় প্রযুক্তিতে বিভিন্ন অটোমেশন ও টেস্টিং প্ল্যান্ট স্থাপন তাদের সক্ষমতার প্রমাণ।

তবে ৩৩০টি মঞ্জুরিকৃত পদের বিপরীতে মাত্র ১১০ জন জনবল নিয়ে এই সক্ষমতা কতদিন ধরে রাখা সম্ভব—এটাই এখন বড় প্রশ্ন।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দ্রুত জনবল নিয়োগ, নির্ধারিত ওভারহোলিং নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় জেনুইন স্পেয়ার পার্টস সময়মতো সরবরাহ করা গেলে ‘কুইক ফিক্স’ ও ‘রিপিট ফেইলিওর’-এর চক্র থেকে বের হয়ে আরও নির্ভরযোগ্য রেল ইঞ্জিন বহর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর