শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের বিরুদ্ধে খাস কালেকশনের আড়ালে অর্ধ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ

মেরিনা রেমি, বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

ঢাকা বরিশাল মহাসড়কের ওপর অবস্থিত বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর সেতু এবং মেজর এম এ জলিল সেতু দক্ষিণাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। বাবুগঞ্জের সুগন্ধা নদীর ওপর ৩৯০ মিটার দীর্ঘ দোয়ারিকা সেতু এবং উজিরপুরের সন্ধ্যা নদীর ওপর ২৯২ মিটার দীর্ঘ শিকারপুর সেতু মিলে প্রায় ১১২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়। ২০০৩ সালের ১২ এপ্রিল যান চলাচলের জন্য উদ্বোধন হওয়া এই সেতু দুটির নামকরণ করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের দুই বীরের স্মরণে। প্রতিদিন এই দুই সেতু দিয়ে চলাচল করে দক্ষিণাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ এবং পণ্যবাহী যানবাহন।

সম্প্রতি এই সেতু দুটির টোল আদায় নিয়ে স্থানীয় মহল ও সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগে বলা হচ্ছে, ইজারা শেষে খাস কালেকশন পদ্ধতিতে আদায়কালে সেতু দুটিতে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা টোল উঠলেও সরকারি কোষাগারে জমা পড়েছে তার অর্ধেকেরও কম। এই বিশাল ব্যবধানকে লোপাট হিসেবে চিহ্নিত করে সামাজিক মাধ্যমে বরিশাল সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল ইসলামের নাম সরাসরি উল্লেখ করা হচ্ছে। এমনকি দৈনিক তেরো লাখ টাকা আদায়ের বিপরীতে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট হিসাবও ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

সেতু দুটির টোল ইজারার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ২০২১ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এক হাজার ছিয়ানব্বই দিনের জন্য মেসার্স রহমান ট্রেডার্সকে ভ্যাট ও আয়করসহ ৫৮ কোটি ৭৬ লাখ ৪০ হাজার টাকায় সেতু দুটির টোল ইজারা দেওয়া হয়েছিল। ২০২২ সালের জুনে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর এই সেতু দুটির টোল আয় প্রায় চারগুণ বেড়ে যায়। সে সময় প্রতিদিন ন্যূনতম ৯ লাখ থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত টোল আদায় হওয়ার তথ্য প্রকাশ পায়। ইজারা মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন ইজারার জন্য মূল্যায়ন ছাড়া আগের মূল্যের সঙ্গে মাত্র সাত শতাংশ যোগ করে তা অনুমোদনের চেষ্টা হলে সরকারের প্রায় ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব হারানোর শঙ্কার কথা তখনই উঠেছিল।

টোল নিয়ে বরিশালে সংঘাতের পুরনো ইতিহাসও আছে। ইজারাদারের মেয়াদ শেষে সওজ সরাসরি আদায়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্ধিত হারে টোল কার্যকর হলে সেতুর টোল প্লাজায় পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে সওজ কর্মচারীদের দিনভর বাদানুবাদের ঘটনা ঘটেছে। চালকদের অভিযোগ ছিল, মিনি পিকআপের টোল ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০ টাকা করা হয়েছে। সে সময় বরিশাল সড়ক বিভাগের এক উপসহকারী প্রকৌশলী সাফাই গলায় বলেছিলেন, সরকার নতুন বর্ধিত হারে টোল নির্ধারণ করেছে, তবে পূর্বের ইজারাদারের চুক্তিতে পুরনো টোলের কথা থাকায় তা কার্যকর করা যায়নি। ইজারা পরবর্তী খাস আদায়ের সময় আদায় ও জমার হিসাবে ব্যবধান দেখা দেওয়া নতুন ঘটনাও নয়, কুষ্টিয়ার মাসুদ রুমি সেতুসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে ইজারা শেষে খাস আদায়কালে রাজস্ব কম দেখানোর অভিযোগ আগেও উঠেছে।

এরই মধ্যে এক সংবাদ প্রতিবেদনে দোয়ারিকা সেতুতে সরকারি রসিদ ছাড়া টোল আদায়ের অভিযোগ তোলা হয়েছে। প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার নাম উল্লেখ না থাকলেও সেতু দুটির প্রশাসনিক দায়িত্ব বরিশাল সড়ক বিভাগের হাতে, এ কথা স্পষ্ট। রসিদবিহীন আদায়ের এই অভিযোগ সেতুতে টোল আদায়ের অস্বচ্ছতা নিয়ে পাওয়া সবচেয়ে সাম্প্রতিক মাধ্যম উল্লেখ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অন্যদিকে নাজমুল ইসলামের নেতৃত্বে বরিশাল সওজ যে অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ব্যবস্থা নিয়েছে, সেটিরও নজির আছে। মীরগঞ্জ ফেরিঘাটে ইজারাদারদের জুলুম, নির্যাতন ও সরকারি নির্ধারিত ভাড়ার কয়েকগুণ টাকা আদায়ের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের সত্যতা তদন্তে নিশ্চিত হয়ে ইজারা বাতিল করা হয় এবং জামানত বাজেয়াপ্ত করা হয়। ফলে যেখানে আগে আড়াই কোটি টাকার ঘাট ইজারার দরপত্র দুই পক্ষের টানাটানিতে পৌঁছে যায় ১৬ কোটি টাকায়, সেখানে যাত্রীদের পারাপার ভাড়া স্বাভাবিক হয়ে কয়েক লাখ মানুষ স্বস্তি ফিরে পায়।

বরিশাল সড়ক বিভাগের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টোল ইজারা বা অন্য কোনো ক্ষেত্রে অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই। স্বীকৃত নীতিমালার মধ্য দিয়ে একাধিক ধাপ পেরিয়ে টোল নির্ধারণ করা হয় এবং বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি। অভিযোগের ব্যাখ্যা জানতে নাজমুল ইসলামকে একাধিকবার ফোন করা হলে তিনি রিসিভ করেননি, ফলে সেতু দুটির খাস আদায়কালীন আদায় ও জমার ব্যাখ্যা এখনো তাঁর পক্ষ থেকে মেলেনি।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ সালের ৫ ধারার অধীনে মামলা হতে পারে, যেখানে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। আর দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী এ ধরনের অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা কমিশনের হাতে ন্যস্ত। ফলে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, অভিযোগকারীকে তা প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশন বা সওজ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ আকারে উপস্থাপনের আইনি পথও রয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই পর্যায়ে গঠনমূলক পথ একটিই। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং দুর্নীতি দমন কমিশন দোয়ারিকা ও শিকারপুর সেতুর ইজারা শেষে খাস আদায়ের পুরো সময়কালের দৈনিক টোল রসিদ, ব্যাংকে জমার হিসাব এবং যানবাহন গণনার ভিত্তিতে একটি তুলনামূলক নিরীক্ষা প্রকাশ করতে পারে। অভিযোগ সত্য হলে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা, মিথ্যা হলে জনসমক্ষে প্রতিবেদনের মাধ্যমে খণ্ডন, উভয়ই জনস্বার্থে। সেই সঙ্গে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তোলা রসিদবিহীন আদায়ের অভিযোগও তদন্তের অংশ হওয়া জরুরি, যাতে সত্যিকারের অনিয়ম ঢাকা না পড়ে এবং গুজবের সঙ্গে প্রমাণ একাকার না হয়। সেতু দুটির প্রতিদিনের লক্ষ লক্ষ ব্যবহারকারীর কাছে হিসাব পরিষ্কার করতে পারে কেবল উন্মুক্ত তথ্যপ্রমাণ, তোলপাড় নয়।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর