শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরপর তিন অর্থবছরে এলজিইডিতে ব্যয় সক্ষমতায় ধস: আটকে থাকছে হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ, জুনে সমন্বয়ের নাটক

বিশেষ প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে নজিরবিহীন সক্ষমতার সংকট ও ধারাবাহিক ধস নেমেছে। সংস্থাটির অভ্যন্তরীণ অডিট ও অগ্রগতি সংক্রান্ত ধারাবাহিক চারটি অর্থবছরের নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় পরবর্তী অর্থ বছরগুলোতে বাজেট বরাদ্দ যেমন সংকুচিত হয়েছে, তেমনি প্রকৃত ব্যয় ও বাস্তবায়নের হার আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। বিশেষ করে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদানের অর্থ ব্যবহারে চরম ব্যর্থতা এবং অর্থ বছরের শেষ সপ্তাহে (জুন মাসে) উপযোজনের নামে শত শত কোটি টাকার তড়িঘড়ি সমন্বয় নিয়মিত প্রশাসনিক রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

তিন অর্থবছরের ব্যয়ের চিত্র: ধারাবাহিক পতন

এলজিইডির ২০২৩-২৪, ২০২৪-২৫ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুন মাসের সমাপনী প্রতিবেদন বিশ্লেষণে বাস্তবায়ন সক্ষমতার স্পষ্ট অবনতি ধরা পড়ে:

* ২০২৩-২৪ অর্থবছর: সংশোধিত এডিপিতে (আরএডিপি) বরাদ্দ ছিল ২১,৯৫,১৩০.০০ লক্ষ টাকা। বিপরীতে ব্যয় হয় ২১,২০,৪১৩.৮৮ লক্ষ টাকা, যার আর্থিক বাস্তবায়ন হার ছিল ৯৬.৬০ শতাংশ।

* ২০২৪-২৫ অর্থবছর: বরাদ্দ কমে দাঁড়ায় ১৯,৯৪,১৮৩.০০ লক্ষ টাকায় এবং ব্যয় হয় ১৮,১০,৮৮৫.৪৫ লক্ষ টাকা। বাস্তবায়ন হার নেমে আসে ৯০.৮১ শতাংশে।

* ২০২৫-২৬ অর্থবছর: সংকট আরও ঘনীভূত হয়ে আর এডিপি বরাদ্দ দাঁড়ায় ১৯,১৪,৯৬৮.৩৭ লক্ষ টাকা। কিন্তু অর্থবছর শেষে সংস্থাটি খরচ করতে পেরেছে মাত্র ১৬,১১,০৬৯.৪১ লক্ষ টাকা। ফলে বার্ষিক আর্থিক অগ্রগতি নজিরবিহীনভাবে ধসে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮৪.১৩ শতাংশে।

দুই বছরের ব্যবধানে সংস্থাটির সামগ্রিক আর্থিক বাস্তবায়নের হার কমেছে ১২.৪৭ শতাংশ এবং প্রকৃত ব্যয় সংকোচন ঘটেছে ৫,০৯,৩৪৪ লক্ষ টাকারও বেশি।

বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ব্যবহারে স্থবিরতা

উন্নয়ন সহযোগীদের (বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা, কেএফডব্লিউ) অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলোতে অর্থ ব্যয়ের অক্ষমতা সংস্থাটির উন্নয়ন কার্যক্রমকে স্থবির করে তুলেছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বৈদেশিক প্রকল্প সহায়তা (PA) খাতে ৫,৮৭,৩৬৫.৬৫ লক্ষ টাকা বরাদ্দ থাকলেও এলজিইডি খরচ করতে পেরেছে মাত্র ৪,৪৯,৬৭৫.১৬ লক্ষ টাকা (বাস্তবায়ন মাত্র ৭৬.৫৬%)। অর্থাৎ একক বছরে সংস্থাটিকে প্রায় ১,৩৭,৬৯০ লক্ষ টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান ব্যবহার করতে না পেরে ফেরত বা সারেন্ডার করতে হয়েছে।

মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘বি-স্ট্রং’ (B-STRONG) প্রকল্পে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩,১৪৮.০০ লক্ষ টাকার বিপরীতে খরচ হয়েছে মাত্র ৩৭৬.৭১ লক্ষ টাকা (১১.৯৭%)। এছাড়া এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত ‘আইইউজিআইপি’ প্রকল্পে ৬৯.৩৬ শতাংশ এবং বিশ্বব্যাংকের ‘রেজিলিয়েন্ট আরবান’ প্রকল্পে মাত্র ৪০.৬০ শতাংশ ব্যয় অর্জিত হয়েছে।

জুনের সমন্বয় ও শেষ মুহূর্তের ‘উপযোজন নাটক’

প্রতিবেদনের মন্তব্য কলামে প্রতিটি অর্থবছরের জুন মাসের ৩ থেকে ১৪ তারিখের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা কমিশনের কার্যক্রম বিভাগ থেকে দফায় দফায় বরাদ্দ রদবদলের চিত্র পাওয়া গেছে। মাঠপর্যায়ে বাস্তব কাজ না করে অর্থবছর শেষে ব্যয়ের খাতা মেলানোর জন্য এক প্রকল্পের বরাদ্দ কেটে অন্য প্রকল্পে রাতারাতি ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি বা হ্রাস করা হয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জুনে ‘দেশের দক্ষিণাঞ্চলের আয়রন ব্রিজ পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে’ শেষ মুহূর্তে ৫০ কোটি টাকা এবং ‘বৃহত্তর নোয়াখালী পল্লী অবকাঠামো প্রকল্পে’ ৪৯.১৬ কোটি টাকা বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়। বিপরীতে বাস্তবায়নহীন একাধিক চলমান প্রকল্পের বরাদ্দ ২০ থেকে ৪৫ কোটি টাকা পর্যন্ত কমিয়ে দেওয়া হয়।

কেরানীগঞ্জ প্রকল্প: স্থবিরতার চরম প্রতীক

আলোচিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে চরম ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প’ (কোড: ২২৪৩৪৮৭০০)।

* ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ৪,৪৬৯.০০ লক্ষ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ৪,৪১০.১৪ লক্ষ টাকা (৯৮.৬৮%) খরচ দেখানো হয়।

* ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ একলাফে বাড়িয়ে ১৫,০০০.০০ লক্ষ টাকা করা হলেও খরচ হয় মাত্র ৫,০২০.১৮ লক্ষ টাকা (৩৩.৪৭%)।

* ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পুনরায় ১৪,০০০.০০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া সত্ত্বেও ব্যয় আরও কমে দাঁড়ায় ৩,৭৯০.৫৬ লক্ষ টাকায় (২৭.০৮%)।

* চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই মাসে প্রকল্পটিতে ব্যয় ছিল মাত্র ২৫.৫২ লক্ষ টাকা (০.২১%), যা পরবর্তী মাসেই (আগস্টে) একলাফে ১,৮৫৪.৯৯ লক্ষ টাকায় উন্নীত দেখানো হয়েছে।

একইভাবে নারায়ণগঞ্জের ‘কদমরসুল ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্প’-এ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৯,০৭৭.২০ লক্ষ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১,০০৪.৩৪ লক্ষ টাকা (১১.০৬%)। নারায়ণগঞ্জের ‘লাঙ্গলবন্দ পুণ্যস্নান অবকাঠামো প্রকল্প’-এ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত ২,৫০০ লক্ষ টাকার পুরো অর্থই (০.০০%) খরচ করতে ব্যর্থ হয় সংস্থাটি।

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরুতে ধীরগতির পুনরাবৃত্তি

এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসের (জুলাই ও আগস্ট ২০২৬) অগ্রগতি প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংস্থাটির পুরোনো ধারাই অব্যাহত রয়েছে।

* অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ১৬,৮১,৯০৫.৩২ লক্ষ টাকা মূল এডিপি বরাদ্দের বিপরীতে সংস্থাটি খরচ করেছে মাত্র ৩০,২৬৩.০৮ লক্ষ টাকা (১.৮০%)।

* আগস্ট শেষে দুই মাসে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৭৬,৯৫৪.৮৩ লক্ষ টাকা, যা মোট বরাদ্দের মাত্র ৪.৫৮ শতাংশ।

* এর মধ্যে কৃষি ও সেচ খাতের অগ্রগতি আগস্ট পর্যন্ত মাত্র ০.২১ শতাংশ এবং বৈদেশিক ঋণ সহায়তার প্রকল্পগুলোতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ০.৭০ শতাংশ।

পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকল্প গ্রহণ, অদক্ষ দুর্নীতিবাজ পিডি নিয়োগ, টেন্ডার জটিলতা এবং অর্থবছরের শুরুতে কাজ ফেলে রেখে শেষ মাসে বিল ভাউচার তৈরির চিরাচরিত সংস্কৃতির কারণেই স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর এমন দীর্ঘস্থায়ী আর্থিক ও কাঠামোগত অচলাবস্থার মধ্যে পড়েছে।(চলবে)

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর