জমি-জমা সংক্রান্ত সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের শেষ ভরসার জায়গা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। তবে নেত্রকোনার পূর্বধলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সরকারি নির্ধারিত ফি’র অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সেবা প্রদানে হয়রানি ও দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অফিস সহকারী হাফিজ উদ্দিন ও নকলনবিশ শ্রী সুজন চন্দ্র দাসকে ঘিরে একটি সিন্ডিকেট এসব অনিয়ম করছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা ও স্থানীয় দলিল লেখক।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত ফি দিয়ে সেবা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে বিভিন্ন সেবার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হচ্ছে। টাকা দিতে না চাইলে নানা অজুহাতে সেবা পেতে বিলম্ব করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি পূর্বধলা উপজেলার এক কৃষক তাঁর জমির স্ট্যাম্প কম্পোজ করা দুটি নকল তুলতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যান। তাঁর দাবি, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী এ কাজে সামান্য ফি দেওয়ার কথা থাকলেও অফিস সহকারী হাফিজ উদ্দিন তাঁর কাছে কয়েক হাজার টাকা দাবি করেন।
অতিরিক্ত অর্থ দিতে অপারগতা প্রকাশ করে তিনি সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সাব-রেজিস্ট্রার নকলনবিশ সুজন চন্দ্রকে ডেকে শুধু সরকারি ফি নেওয়ার মৌখিক নির্দেশ দেন। তবে ওই নির্দেশের পরও নির্ধারিত অর্থের বাইরে টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘‘টাকা না দিলে তারা নানাভাবে হয়রানি করে। কখনো বলে ফাইল পাওয়া যাচ্ছে না, কখনো সই লাগবে, আবার কখনো পরদিন আসতে বলে। নিরুপায় হয়ে টাকা দিতে হয়েছে।’’
তবে অভিযোগে উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ ও সরকারি ফি’র নির্দিষ্ট হার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
সেবাগ্রহীতাদের আরও অভিযোগ, দলিল রেজিস্ট্রির পর অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় রসিদ বা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র সময়মতো দেওয়া হয় না। মাসের পর মাস অফিসে ঘুরেও এসব কাগজপত্র পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
এতে দলিল বা সংশ্লিষ্ট নথি কবে পাওয়া যাবে, সে বিষয়ে সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ।
নকলনবিশ সুজন চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, তাঁর নির্ধারিত সরকারি কাজের পাশাপাশি নকল সরবরাহের কার্যক্রমকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় বালাম বইয়ে দলিল লিপিবদ্ধ ও নথি হালনাগাদে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন দলিল লেখক অভিযোগ করে বলেন, ‘‘এখানে অতিরিক্ত টাকা না দিলে অনেক কাজ সময়মতো হয় না। টাকা দিলে দ্রুত কাজ হয়ে যায়—এমন অভিযোগ আমরা প্রায়ই শুনি।’’
তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি যাচাইয়ের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
নকলনবিশ সুজন চন্দ্র দাসকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি। তাঁদের দাবি, অতীতে একটি রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার পরিচয় ব্যবহার করে তিনি অফিসে প্রভাব বিস্তার করেছেন। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পরও অফিস সহকারী হাফিজ উদ্দিনের সঙ্গে সমন্বয় করে একই ধরনের অনিয়ম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
তবে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও প্রভাব বিস্তারের এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
একাধিক সেবাগ্রহীতার অভিযোগ, অনিয়মের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেও কার্যকর প্রতিকার পাওয়া যায় না।
একজন সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘‘স্যারও এদের কিছু বলেন না। বললেও তারা শোনে না। আমরা সরকারি ফি দিয়ে সেবা চাই, ঘুষ দিয়ে নয়।’’
এসব অভিযোগের বিষয়ে স্থানীয় সচেতন মহল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাঁরা জেলা রেজিস্ট্রার কার্যালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে পূর্বধলা সাব-রেজিস্ট্রারের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ভুক্তভোগী, স্থানীয় দলিল লেখক ও স্থানীয় সূত্রের বক্তব্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা হয়েছে। অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযুক্তদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
এই বাংলা/এমএস