শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

শিক্ষার্থীদের ভরসা ছাবেদের ক্যান্টিন, ২০ টাকায় মেলে খিচুড়ি-পরাটা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ শুক্রবার, ৯ অক্টোবর, ২০২৬

 

দুপুর হলেই ক্যান্টিনে ভিড় বাড়ে। কেউ নিচ্ছেন খিচুড়ি, কেউ পরোটা বা রুটি। খাবার নিয়ে ব্যস্ত শিক্ষার্থীদের মুখে স্বস্তির ছাপ। কারণ, এসব খাবারের দাম মাত্র ২০ টাকা। প্রায় এক বছর ধরে শিক্ষার্থীদের সামর্থ্যের কথা বিবেচনা করে এভাবেই কম দামে খাবার দিয়ে আসছেন মোঃ ছাবেদ আলী।

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ফটকের ভেতরে মোঃ ছাবেদ আলীর ক্যান্টিন। ক্যান্টিনের নাম দিয়েছেন ‘খাদ্য ছাঁয়া স্কুল ক্যান্টিন’। শিক্ষার্থীদের কাছে ক্যান্টিনটি পরিচিত ২০ টাকার খাবারের জন্য।

মোঃ ছাবেদ আলীর নিজের জীবনও সচ্ছলতার নয়। আগে গ্রামের বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনে রান্না করে যে আয় হতো, তা দিয়েই চলত তার সংসার। বসতভিটা বলতে মাত্র দুই শতক জমি, সেটিও অন্যের। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সব হারিয়ে বর্তমানে শৌলমারী বাজারের পাশে অন্যের জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন তিনি।

জানা গেছে, প্রায় এক বছর আগে স্থানীয় মানুষের সহায়তায় কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের মূল ফটকের ভেতরে ক্যান্টিন চালুর সুযোগ পান মোঃ ছাবেদ আলী। সেই ক্যান্টিনই এখন তার কর্মস্থল। ক্যান্টিন চালুর পর নিজের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য কম দামে খাবারের ব্যবস্থা করেন তিনি।

তবে ২০ টাকায় খাবার বিক্রি করে খুব বেশি লাভ হয় না তার। খিচুড়ি, পরোটাসহ বিভিন্ন খাবার তৈরিতে নানা উপকরণ কিনতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে রান্না ও পরিবেশনের খরচ। বর্তমানে তার ক্যান্টিনে ছয়জন কর্মচারী কাজ করেন। তাদের বেতনসহ সব খরচ মেটানোর পর খুব বেশি টাকা হাতে থাকে না।

তবু ২০ টাকার খাবার বন্ধ করেননি মোঃ ছাবেদ আলী। স্কুল চলাকালে শিক্ষার্থীরাই ক্যান্টিনের প্রধান ক্রেতা। কম দামের কারণে শিক্ষার্থীরা এখানেই দুপুরের খাবার খায়। ক্লাস শেষ হলে বাইরের ক্রেতাদের ভিড় বাড়ে। তাদের কাছে বিভিন্ন খাবার বিক্রি করে ক্যান্টিনের বেচাকেনা কিছুটা বাড়ে।

প্রায় এক বছর ধরে এভাবেই চলছে ছাবেদ আলীর ক্যান্টিন।

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী মোঃ ফেরদৌস শাহারিয়ার জানায়, ‘আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য এখানে ক্যান্টিন চালু করা হয়েছে, যাতে খাবারের জন্য বাইরে যেতে না হয়। এখানে ২০ টাকার বিনিময়ে ভালো খাবার পাওয়া যায়।’

একই শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী মোঃ ফরহাদ হোসেন জানায়, ‘আমাদের স্কুলের ক্যান্টিনটি খুবই মানসম্মত। মাঝে মাঝে খাবারে ছাড়ও দেওয়া হয়। বাজারে যে খাবারের দাম ৩০ থেকে ৩৫ টাকা, সেটি এখানে ২০ টাকায় পাওয়া যায়। ২০ টাকায় মাংসের খিচুড়িও পাওয়া যায়। এটা আমাদের জন্য খুবই উপকারী।’

ক্যান্টিনের উদ্যোক্তা মোঃ ছাবেদ আলী বলেন, ‘বাইরের খাবারগুলো সব সময় মানসম্মত পাওয়া যায় না। আগে বিভিন্ন বাড়িতে অনুষ্ঠানে রান্না করে বেড়াতাম। পরে এলাকাবাসী আমাকে এখানে এনে ক্যান্টিন করার সুযোগ করে দিয়েছে। আমি নিজেও কিছুটা পঙ্গু।’

তিনি বলেন, ‘খিচুড়ি, পরোটা, ডাল, রুটি বা অন্যান্য খাবার ২০ টাকায় দিলেও এতে আমার লাভ হয় না। অনেক সময় কেউ ২০ টাকার খাবার ১০ টাকাতেও খায়। তবে স্কুলের সময়ের বাইরে অন্য ক্রেতারা আসেন। তখন যে লাভ হয়, তা দিয়েই কোনোরকমে সংসার চলছে। আমার সংসারও ছোট।’

প্রায় এক বছর ধরে ক্যান্টিনটি চলছে। প্রতিদিন ৮০-১০০ শিক্ষার্থী খাবার খায়। স্কুল চলাকালে শুধু শিক্ষার্থীদেরই খাবার দেওয়া হয়। স্কুল চলাকালে বাইরের ক্রেতাদের কাছে খাবার বিক্রি করা হয় না বলেও জানান তিনি।

কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোঃ খলিলুর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে স্কুলে একটি ক্যান্টিন চালুর চিন্তাভাবনা ছিল। স্কুলের পাশের বাসিন্দা মোঃ ছাবেদ আলীও একজন অসহায় মানুষ। ২০২৫ সালের শেষের দিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে মোঃ ছাবেদ আলীর মাধ্যমে ক্যান্টিনটি চালু করা হয়। ক্যান্টিনটির স্বত্বাধিকারী চর শৌলমারী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় হলেও এটি পরিচালনা করেন ছাবেদ আলী।’

তিনি বলেন, ‘ক্যান্টিনটি চালু হওয়ায় আমাদের শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে। তারা অল্প দামে খাবার খেতে পারছে। আমরা নিয়মিত ক্যান্টিনটি তদারকি করি। আশপাশের অন্য হোটেলের তুলনায় ক্যান্টিনের খাবারের মানও ভালো।’

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর