নাটোরের গুরুদাসপুরে ছাত্রদল নেতা শাকিল ইসলাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে গুরুদাসপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হান্নানকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) রাজশাহী রেঞ্জের ডিআইজি মো. আশিক সাঈদের স্বাক্ষরিত এক আদেশে এ সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
আদেশে বলা হয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত জনস্বার্থে ওসি আবদুল হান্নানকে রাজশাহী রেঞ্জে সংযুক্ত করা হয়েছে। তাঁকে ডিআইজির কার্যালয়ে যোগদানের জন্য আদেশ জারির দিনই গুরুদাসপুর থানা থেকে ছাড়পত্র দিতে বলা হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর রাত ৯টার দিকে গুরুদাসপুর পৌর শহরের চাঁচকৈড় বাজারপাড়া এলাকায় হেলমেট পরা সশস্ত্র দুর্বৃত্তদের হামলার শিকার হন পৌর ছাত্রদলের সদস্যসচিব শাকিল ইসলাম (৩২)। হামলাকারীরা তাঁকে কুপিয়ে জখম করে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে রাজধানীর বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ১২ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাত সাড়ে ৮টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় ১৯ অক্টোবর অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন শাকিলের পরিবার। তবে সোমবার পর্যন্ত মামলায় কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের একাধিক সূত্রের দাবি, শাকিল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজের বড় ছেলে নুরুজ্জামান মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার বিকেলে তাঁকে আদালতে হাজির করা হলে আদালত তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। এ ছাড়া মিন্টুকে যুবদলের যুগ্ম সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করেছে কেন্দ্রীয় যুবদল।
স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য, মিন্টুর সঙ্গে প্রবাসী রাসেলের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। শাকিল হত্যাকাণ্ডে মিন্টুর পাশাপাশি রাসেলেরও সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে—এমন সন্দেহ থেকে শাকিলের জানাজায় অংশ নেওয়া কিছু লোকজন দোকানপাট ভাঙচুর ও লুটপাট করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এ ঘটনার বিষয়ে থানায় মামলা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নিহত শাকিলের বাবা রবিউল মিস্ত্রি পুলিশের বিরুদ্ধে তদন্তে গাফিলতির অভিযোগ করেছেন। তাঁর দাবি, ১৪ অক্টোবর ছেলেকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার পর তিনি ১৯ অক্টোবর গুরুদাসপুর থানায় হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। সে সময় সংসদ সদস্যের নির্দেশে প্রবাসী রাসেলের নাম এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরে আবার তাঁর নির্দেশেই রাসেলের নাম বাদ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন রবিউল।
শাকিলের বাবার অভিযোগ, সংসদ সদস্যের ছেলে মিন্টুকে গ্রেপ্তার করা হলেও এ ঘটনায় অন্য কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ছেলের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরও পুলিশের কার্যকর পদক্ষেপ ছিল না বলে দাবি করেন তিনি। ছেলের হত্যাকাণ্ডের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করেছেন রবিউল।
গত ২০ এপ্রিল নিজের ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে শাকিল নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়েছিলেন। পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমি আমার জীবন নিয়ে সংশয়ে আছি খুবই। আমাকে মারার জন্য এক বড় ভাই বিভিন্ন চক্র ও গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করতেছে। যারা আমাকে মারতে পারবে, তাদের নাকি অনেকগুলো টাকা দেওয়া হবে।’
ওই পোস্টে শাকিল আরও দাবি করেন, এ বিষয়ে তিনি ওসির সঙ্গে কথা বলে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছিলেন এবং সেখানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নাম উল্লেখ করেছিলেন। তাঁর কিছু হলে ওই জিডির ভিত্তিতে মামলা করার কথাও পোস্টে লিখেছিলেন তিনি।
এ বিষয়ে নাটোর জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক নজরুল ইসলাম নির্দিষ্ট কোনো মন্তব্য করেননি। তিনি বলেন, সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই শাকিল হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে।
নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখারের আলম বলেন, গুরুদাসপুর থানার ওসি আবদুল হান্নানকে জনস্বার্থে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
এই বাংলা/এমএস