মৌলভীবাজারে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্র প্রবেশের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি বলেছেন, দলীয় প্রভাবের মধ্যে নির্বাচন হলে তা সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনা কম। নির্বাচনের আগে সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) সকাল ১১টায় মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসের মুন হলরুমে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো ভালো কোনো লক্ষণ দেখছি না। বিএনপির একজন অবসরপ্রাপ্ত ক্যাডারকে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একজন দলীয় ব্যক্তিকে এখানে কেন নিয়ে আসতে হবে, তা জনগণের প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নিজ এলাকায় গিয়ে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী না হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হবে না বলে বক্তব্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে আগেভাগেই জনগণকে ভয় দেখানো হচ্ছে, যা সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশের জন্য ইতিবাচক নয়।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে জামায়াতের আমীর বলেন, নির্বাচনের পথ সুগম করতে তাঁরা চেষ্টা করবেন এবং সবার জন্য সমান সুযোগ বা ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিশ্চিত করার দাবি জানাবেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবেশ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিবেচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অর্থ ও অস্ত্র প্রবেশের প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “ভারত থেকে যদি দেশে অবৈধ টাকা ও প্রাণঘাতী অস্ত্র প্রবেশ করে, তবে এতে সরকার থেকে লাভ কী? সীমান্ত দিয়ে এসব অবৈধ অস্ত্র ও অর্থ ঢুকলে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ছাড়া আর কিছুই হয় না।”
তিনি বলেন, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে সীমান্ত সুরক্ষা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব।
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো বলে দাবি করা হলেও এর মূল্যায়নের মাপকাঠি কী, তা স্পষ্ট নয়। তাঁর অভিযোগ, মাদক ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ এবং সমাজে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
সাংবাদিকদের ভূমিকা তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবাদপত্র সমাজের আয়না। এর মাধ্যমে সমাজের দোষ-ত্রুটি ও বাস্তব চিত্র উঠে আসে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে সংবাদমাধ্যমের ওপর আঘাত আসে এবং বহুদলীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন। সে সময় চারটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া অন্যগুলোর প্রকাশনা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলেও বক্তব্য দেন তিনি।
মতবিনিময় সভায় সাংবাদিকেরা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, বৈদেশিক নীতি ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন করেন। ডা. শফিকুর রহমান সেসব প্রশ্নের উত্তর দেন এবং সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে স্বাধীনতা ও সঠিক তথ্য প্রকাশের গুরুত্ব তুলে ধরেন।
মৌলভীবাজার জেলা জামায়াতের আমীর ইঞ্জিনিয়ার মো. শাহেদ আলীর সভাপতিত্বে সভাটি সঞ্চালনা করেন জেলা সেক্রেটারি মো. ইয়ামীর আলী। এতে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, সিলেট মহানগর জামায়াতের আমীর মো. ফখরুল ইসলাম, হবিগঞ্জ জেলা জামায়াতের নেতৃবৃন্দ এবং স্থানীয় জামায়াতের অন্যান্য দায়িত্বশীল ব্যক্তি। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে মৌলভীবাজার সার্কিট হাউসে পৌঁছালে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে পুলিশের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার প্রদান করে। সকালে সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান জামায়াতের কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা।
পরে তিনি মৌলভীবাজার শহরের শিল্পকলা একাডেমিতে আয়োজিত ওয়ার্ড দায়িত্বশীল সম্মেলন ও রুকন সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নিজ জেলা মৌলভীবাজারে এটি ছিল তাঁর প্রথম সফর। তাঁকে ঘিরে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যায়।
এই বাংলা/এমএস