সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬, ০৯:৪০ অপরাহ্ন

ব্লেড আর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়েই ৩৫ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে চুল কাটছেন আবেদ তেলি

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ সোমবার, ২৪ আগস্ট, ২০২৬

কাঁচি, চিরুনি কিংবা আধুনিক কোনো সরঞ্জাম নেই। ডান হাতে একটি ব্লেড আর বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করেই মানুষের চুল কেটে দিচ্ছেন মো. আবেদ তেলি। বিনিময়ে নেন না কোনো পারিশ্রমিক। এভাবেই প্রায় ৩৫ বছর ধরে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রনজিতেশ্বর গ্রামের অসচ্ছল মানুষের সেবা করে আসছেন তিনি।

আবেদ তেলি নিজেও অর্থনৈতিকভাবে অসচ্ছল। জীবিকা নির্বাহের জন্য রয়েছে ছোট একটি দোকান। পাশাপাশি সাইকেলে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ফলদ গাছে ওষুধ দেওয়ার কাজ করেন। এসব কাজের আয়েই চলে তার সংসার। তবে নিজের অভাব-অনটনের মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে মানুষের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে সময় দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

তার চুল কাটার পদ্ধতিই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। কাঁচি, খুর কিংবা চিরুনি ছাড়াই শুধু একটি ব্লেড দিয়ে চুল কাটেন তিনি। ডান হাতে ব্লেড চালানোর সময় বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলকে চিরুনির মতো ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় এই অদ্ভুত কৌশলেই বেশ দক্ষ হয়ে উঠেছেন আবেদ তেলি।

তিনি জানান, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জনের চুল কাটেন। বিশেষ করে অর্থের অভাবে যারা নিয়মিত নাপিতের দোকানে গিয়ে চুল কাটাতে পারেন না, তাদের অনেকেই তার কাছে আসেন। কেউ নিজের পছন্দের ধরন জানালে সেভাবেই চুল কেটে দেন তিনি।

আবেদ তেলি বলেন, “ছেলে-পেলে আসে, আমাকে বলে ভালো করে কেটে দেন। যে যেভাবে চায়, আমি সেভাবেই দিয়ে দেই। অনেক খুশি হয়ে যায়।”

তার এই ব্যতিক্রমী সেবার শুরু প্রায় ৩৫ বছর আগে। সেই স্মৃতিচারণ করে আবেদ তেলি বলেন, “এক ছেলে স্কুলে গেইছে। তার মাস্টার চুল ধরি টান দিয়েছে। সে কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি চলি আসছে। বললাম, বাবা কাঁদিস কেন? সে বলল, আমার চুল ধরি টানছে। বললাম, চুল কাটি নিতে পারো না? বললো, আমার পয়সা নাই, আমার আব্বারও পয়সা নাই। সেদিন একটি ব্লেড নিয়ে আসি, চুল কাটা আরম্ভ করি। সেদিন থেকেই আমার চুল কাটা শুরু।”

এরপর থেকে আর থামেননি তিনি। গ্রামের অনেক দরিদ্র মানুষ অর্থের অভাবে সময়মতো চুল কাটাতে পারেন না। তাদের কাছে আবেদ তেলি হয়ে উঠেছেন ভরসার মানুষ। শুধু চুল কাটাই নয়, পরিচ্ছন্ন থাকার বিষয়েও মানুষকে সচেতন করেন তিনি। কারও মাথায় বড় ও অপরিচ্ছন্ন চুল দেখলে নিজ থেকেই চুল কাটার পরামর্শ দেন। নিয়মিত নখ কাটা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার কথাও বলেন।

কেন কোনো পারিশ্রমিক না নিয়ে এত সময় ব্যয় করেন—এমন প্রশ্নের জবাবে আবেদ তেলি বলেন, “অপরিষ্কার লোক দেখতে ভালো লাগে না। অপরিষ্কার চুল ঝাকড়া-পাকড়া কেমন দেখা যায়। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখলে আমার ভালো লাগে।”

তার কাছে নিয়মিত চুল কাটান মো. আহছান হাবীব হাসান। তিনি বলেন, “ছোটবেলা থেকেই টাকা ছাড়াই আবেদ দাদার কাছে চুল কাটাই।”

আরেকজন চুল কাটানো ব্যক্তি মো. শাহ আলম সরকার বলেন, “টাকার অভাবে চুল কাটাতে না পারলে এটাই আমার শেষ ভরসা।”

স্থানীয় বাসিন্দা আইনজীবী মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, “অভাবের মধ্যেও অন্যের উপকার করার যে মানসিকতা আবেদ তেলির রয়েছে, তা প্রশংসনীয়।”

কুড়িগ্রাম জেলার সহকারী সমাজসেবা কর্মকর্তা মোছা. ববিতা খাতুন বলেন, “নিজের সময় ও শ্রম দিয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। আবেদ তেলির মতো মানুষের উদ্যোগ সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব বাড়াতে পারে।”

নিজের সামর্থ্য সীমিত হলেও মানুষের পরিচ্ছন্নতা ও ভালো লাগার কথা ভেবে প্রায় ৩৫ বছর ধরে বিনা পারিশ্রমিকে চুল কেটে যাচ্ছেন আবেদ তেলি। রাজারহাটের প্রত্যন্ত গ্রামের এই মানুষটির ব্যতিক্রমী উদ্যোগ অর্থের অভাবে চুল কাটাতে না পারা অসচ্ছল মানুষের জন্য আজও হয়ে আছে এক নির্ভরতার জায়গা।

এই বাংলা/এমএস
এই সম্পর্কিত আরো খবর