শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর ২০২৬

ডিমলায় শতবর্ষী ‘গাছবাড়ি’ খেলার মাঠ ছয় ঘণ্টায় দখলমুক্ত

ডিমলা (নীলফামারি) প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার নাউতারা ইউনিয়নের আকাশকুড়ি এলাকার প্রায় ১৫০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘গাছবাড়ি’ খেলার মাঠ দখলের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুপুরে ৪৫ থেকে ৬০ জনের একটি দল মাঠে প্রবেশ করে কয়েক শ গাছের চারা রোপণের মাধ্যমে জায়গাটি দখলের চেষ্টা করে। এ সময় বাধা দেওয়ায় আকাশকুড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরে প্রধান শিক্ষকের লিখিত অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে প্রায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে মাঠটি দখলমুক্ত করা হয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আকাশকুড়ি উচ্চবিদ্যালয় আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও বিদ্যালয়-সংলগ্ন ‘গাছবাড়ি’ মাঠটির ইতিহাস প্রায় ১৫০ বছরের পুরোনো। মাঠসহ সংশ্লিষ্ট জমির পরিমাণ প্রায় ৪ একর ৩৪ শতক। দীর্ঘদিন ধরে এ জমির একাংশে মসজিদ, প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, ক্লিনিক ও বাজারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। অবশিষ্ট অংশটি শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দারা খেলাধুলা এবং বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে আসছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, পাকিস্তান আমলে আকাশকুড়ি মৌজার ৪ একর ৩৪ শতক জমি মহেষ বাবু ভারতীয় বাসিন্দা আকবর বাদশার সঙ্গে বিনিময় করেন। ১৯৫৬ সালে মহেষ বাবু ভারতে চলে যাওয়ার পর বিনিময় সূত্রে জমিটির মালিক হন আকবর বাদশা। পরবর্তী সময়ে জমিটি তাঁর নামে এসএ রেকর্ডভুক্ত হয়।

বিদ্যালয় সূত্রের দাবি, আকবর বাদশা আকাশকুড়ি উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালে দুটি দলিলের মাধ্যমে তিন একর এবং এক একর ৩৪ শতক—মোট ৪ একর ৩৪ শতক জমি বিদ্যালয়ের নামে লিখে দেওয়া হয়। এরপর থেকে জমির অবশিষ্ট অংশ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

তবে পরবর্তী সময়ে বিএস বা হাল রেকর্ডে বিদ্যালয়ের এক একর ৫৫ শতক জমি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে জেলা পরিষদের নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। বিদ্যালয়ের নামে রেকর্ড সংশোধনের জন্য প্রধান শিক্ষক কামিনী কুমার রায় ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে মামলা করেছেন। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নুর আলম, মনিরুজ্জামান, তহিদুল ইসলাম ভুট্টু ও মহুবর রহমানসহ কয়েকজন ব্যক্তি স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় মাঠের জায়গা দখলের চেষ্টা করেন। এ সময় মাঠে আনুমানিক পাঁচ শতাধিক গাছের চারা রোপণ করা হয় বলে তাঁদের দাবি।

ঘটনার পর বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামিনী কুমার রায় ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মাঠে রোপণ করা চারাগুলো সরিয়ে দেয়। প্রশাসনের এ উদ্যোগে ঘটনার প্রায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে মাঠটি দখলমুক্ত হয়।

এ বিষয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা সংবাদকর্মীদের বলেন, “আমাদের দাদার আমল থেকেই এই মাঠ দেখে আসছি। ছোটবেলা থেকে এখানে খেলাধুলা করেছি। এখন আমাদের ছেলে-নাতিরাও এই মাঠে খেলে। কিছু অসাধু মানুষের কারণে মাঠটি দখলের চেষ্টা করা হয়েছিল। প্রশাসনের সহযোগিতায় মাঠটি দখলমুক্ত হওয়ায় আমরা স্বস্তি পেয়েছি।”

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কামিনী কুমার রায় বলেন, মাঠে গাছ লাগানোর বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। পরে প্রশাসনের উদ্যোগে মাঠটি দখলমুক্ত করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরানুজ্জামান বলেন, “আকাশকুড়ি উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে অবৈধভাবে দখল করে গাছ লাগানোর বিষয়ে প্রধান শিক্ষকের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে সরেজমিনে গিয়ে মাঠে লাগানো গাছের চারাগুলো সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।”

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর