রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালে ফার্মাসিস্ট বা দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টোর কিপারের অনুপস্থিতিতে রোগীদের ওষুধ বিতরণের দায়িত্ব পালন করছেন হাসপাতালের একজন বাবুর্চি। চিকিৎসাসেবার মতো স্পর্শকাতর স্থানে এমন ঘটনায় হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনা ও দায়িত্ব পালনের পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের নিয়মিত দায়িত্ব পালনে অনিয়মের অভিযোগও পাওয়া গেছে।
বৃহস্পতিবার সরেজমিনে রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালের বহির্বিভাগের মেডিসিন স্টোরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ওষুধ বিতরণ করছেন হাসপাতালের বাবুর্চি মো. আলমগীর হোসেন।
একজন বাবুর্চি কীভাবে চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন দেখে রোগীদের ওষুধ দিচ্ছেন—এমন প্রশ্ন করা হলে আলমগীর হোসেন জানান, স্টোর কিপার রমজান আলী চিফ মেডিকেল অফিসারের (সিএমও) সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। তবে সিএমওর দপ্তরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সিএমও দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং রমজান আলী সেখানে যাননি।
পরে বিষয়টি নিয়ে পুনরায় জানতে চাইলে আলমগীর হোসেন তাঁর বক্তব্য পরিবর্তন করে জানান, স্টোর কিপার রমজান আলী ছুটিতে রয়েছেন।
স্টোর কিপারের ছুটির বিষয়ে জানতে বহির্বিভাগের উচ্চমান সহকারী মাহফুজ ইসলামের কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকেও পাওয়া যায়নি। জানা যায়, অফিস চলাকালে তিনি ব্যক্তিগত কাজে সন্তানের স্কুলে গিয়েছিলেন।
পরে মুঠোফোনে স্টোর কিপার রমজান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ডিএমওকে মৌখিকভাবে জানিয়ে তিনি ছুটিতে রয়েছেন। তবে স্টোরে তাঁর অনুপস্থিতিতে কে দায়িত্ব পালন করছেন, তা তিনি জানেন না।
এ বিষয়ে হাসপাতালের ডিএমও ডা. শাকিলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বুধবার রমজান আলী ফোন করে বৃহস্পতিবার ছুটির সম্ভাবনার কথা জানিয়েছিলেন। তবে তিনি শেষ পর্যন্ত কর্মস্থলে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা তিনি নিশ্চিত নন।
একজন বাবুর্চির মাধ্যমে ওষুধ বিতরণের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএমও বলেন, স্টোর কিপারের অনুপস্থিতিতে বিকল্প কোনো ফার্মাসিস্ট বা অনুমোদিত কর্মী দায়িত্ব পালন করবেন। কোনোভাবেই একজন বাবুর্চির ওষুধ বিতরণের সুযোগ নেই।
কিছুক্ষণ পর উচ্চমান সহকারী মাহফুজ ইসলাম অফিসে ফিরে এসে রমজান আলীর একটি ছুটির আবেদনপত্র দেখান। তবে ওই আবেদনপত্রে কোনো কর্মকর্তার লিখিত অনুমোদন বা স্বাক্ষর না থাকায় সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। ফলে স্টোর কিপারের অনুপস্থিতিতে বিকল্প কোনো ফার্মাসিস্ট বা অনুমোদিত কর্মীকেও আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে অনিয়মের আরও কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে।
হাসপাতাল সকাল ৮টায় খোলার নিয়ম থাকলেও অভিযোগ রয়েছে, অনেক কর্মচারী সকাল ৯টার দিকে কর্মস্থলে আসেন। আবার দুপুর আড়াইটায় ছুটির সময় নির্ধারিত থাকলেও কেউ কেউ দুপুর দেড়টার মধ্যেই কর্মস্থল ত্যাগ করেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারীর অভিযোগ, স্টোর কিপার রমজান আলী প্রায়ই অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকেন এবং আগে থেকেই একটি ছুটির আবেদন রেখে যান। পরে কর্মস্থলে ফিরে এসে পেছনের তারিখে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এদিকে বহির্বিভাগের অফিস সহকারী লাম খন্দকারের বিরুদ্ধেও নিয়মিত দেরিতে কর্মস্থলে আসার অভিযোগ রয়েছে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে ১১টার মধ্যে কর্মস্থলে আসা এবং দুপুর ১টা থেকে দেড়টার মধ্যে অফিস ত্যাগের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কখনো কখনো দেরিতে এলেও তিনি তাঁর দাপ্তরিক দায়িত্ব যথাযথভাবে সম্পন্ন করেন।
হাসপাতালের ডিএমও ডা. শাকিল আহমেদের দায়িত্ব পালনের সময় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তিনি সপ্তাহে দুই দিন—রোববার ও মঙ্গলবার—রাজশাহীতে দায়িত্ব পালন করেন এবং অন্য দিনগুলোতে পাকশী রেলওয়ে হাসপাতালে কর্মরত থাকেন।
স্থানীয় সূত্র ও হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের মতে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতির ঘাটতি থাকলে কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনে শিথিলতা তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সার্বিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়ে রাজশাহী রেলওয়ে হাসপাতালের চিফ মেডিকেল অফিসার (সিএমও) ডা. মো. আনিছুল হক বলেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে নজর দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।
তিনি বলেন, হাসপাতালটিতে তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। ডিএমও সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করতে পারলে এসব সংকট অনেকটাই কমে আসত। পর্যাপ্ত জনবল চেয়ে প্রতি মাসেই সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন পাঠানো হচ্ছে। পর্যাপ্ত জনবল পাওয়া গেলে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করা সম্ভব হবে।
চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী রোগীদের ওষুধ বিতরণের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে অনুমোদিত ও প্রশিক্ষিত কর্মী ছাড়া অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কি না—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই বাংলা/এমএস