শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

কুড়িগ্রামে প্রাথমিক শিক্ষক বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ, চাপের কথা স্বীকার শিক্ষা কর্মকর্তার

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের অন্তঃউপজেলা বদলিতে নীতিমালা লঙ্ঘন, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, নিয়মনীতি উপেক্ষা করে প্রভাব খাটিয়ে এবং টাকার বিনিময়ে কয়েকজন শিক্ষককে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বদলি-সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করে ১২ শিক্ষকের মধ্যে ৮ জনের বদলিতে অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে।

উপজেলা শিক্ষা অফিসের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্রের দাবি, বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বেলগাছা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. মাহবুবুর রহমান লোকজন নিয়ে শিক্ষা অফিসে যান। সেখানে তিনি শিক্ষা কর্মকর্তাকে চাপ দিয়ে বদলির তালিকা পরিবর্তন করতে বাধ্য করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে মাহবুবুর রহমান এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দিক বদলিতে অনিয়মের অভিযোগ স্বীকার করেছেন। তার ভাষ্য, তিনি রাজনৈতিক ‘চাপে পড়ে বাধ্য’ হয়ে তালিকায় স্বাক্ষর করেছেন। তবে কারা তাকে চাপ দিয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, বুধবার বিকেলে ‘কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক বদলির আবেদন যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তিকরণ বিষয়ক কমিটি’ ১২ শিক্ষকের বদলির আদেশ জারি করে। কমিটির সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সদস্যসচিব উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।

সদরের ১১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শূন্য পদে বদলির জন্য ৪৩ জন শিক্ষক আবেদন করেছিলেন। আবেদনের শেষ সময় ছিল সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১২টা। পরবর্তী সময়ে জারি করা বদলি আদেশ ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে ৮ জনের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের তথ্য পাওয়া যায়।

নথি অনুযায়ী, চার শিক্ষককে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একজন আবেদন না করেও বদলির সুযোগ পেয়েছেন। আরেক শিক্ষককে এমন একটি বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে, যেখানে শূন্য পদ ছিল না এবং ওই বিদ্যালয় তার পছন্দক্রমেও ছিল না। পাঁচ বা তার কম শিক্ষক কর্মরত থাকা বিদ্যালয় থেকে বদলি না করার নির্দেশনাও লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

বদলির তালিকায় থাকা শিক্ষকদের মধ্যে ২ নম্বর ক্রমের মো. বাশিরুল মুমিন খন্দকারকে দুই শিক্ষকের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে, ৩ নম্বর ক্রমের মোছা. রোখসানা পারভীনকে তিনজনের, ৪ নম্বরের শ্রীমতী পাপড়ী রানীকে ছয়জনের এবং ৮ নম্বরের মোছা. ফরিদা বেগমকে ১০ জনের জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে বদলি দেওয়া হয়েছে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তালিকার ১০ নম্বর ক্রমে থাকা মো. আব্দুর রহিমকে সদরের পাঁচগাছি আশরাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি করা হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা অফিসের শূন্য পদের তালিকায় ওই বিদ্যালয়ের নাম ছিল না। একই সঙ্গে তার দেওয়া বদলির পছন্দক্রমেও বিদ্যালয়টির নাম উল্লেখ ছিল না।

অন্যদিকে ১২ নম্বর ক্রমে থাকা মোছা. মাহমুদা আক্তারের বদলির জন্য কোনো আবেদন করার তথ্য পাওয়া যায়নি। শিক্ষা অফিস থেকে প্রকাশিত ৪৩ আবেদনকারীর তালিকাতেও তার নাম ছিল না। পরে তালিকা পরিবর্তন করে তার নাম যুক্ত করে বদলির সুযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ছাড়া বদলির তালিকায় ৫ নম্বরে থাকা মোছা. মনিরা আক্তারের চাকরি ২০১৩ সালে জাতীয়করণ হলেও তাকে ২০১০ সালে যোগদান দেখিয়ে বদলির সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা অর্থের বিনিময়ে বদলি বাণিজ্যে জড়িয়েছেন। তাদের চাপ বা প্রভাবের কারণে নীতিমালা উপেক্ষা করে বদলির আদেশ দেওয়া হয়েছে এবং প্রকৃত দাবিদার শিক্ষকেরা বঞ্চিত হয়েছেন। এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে—এমন তথ্য সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ নেই।

অভিযোগের বিষয়ে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, “আমি অফিসে গিয়ে ইউএনও এবং শিক্ষা কর্মকর্তাকে ধন্যবাদ দিয়ে এসেছি। আমি কোনো চাপ প্রয়োগ করিনি। যারা অভিযোগ তুলেছেন, তারা সঠিক বলেননি।”

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, “আমি অসহায়। বাধ্য হয়েছি। যেসব অভিযোগ তোলা হয়েছে, তা আমি অস্বীকার করছি না। আমাকে তালিকা দিয়ে স্বাক্ষর করতে বলা হয়েছে। আমি স্বাক্ষর করেছি। কে বা কারা চাপ দিয়েছে, তা আমি বলতে পারব না।”

তিনি আরও বলেন, “এক সপ্তাহ আগে এখানে যোগদান করেছি। শিক্ষকদের ভালো করে চিনি না। টাকা নেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি চেয়েছি নীতিমালা অনুযায়ী হোক, শিক্ষকরা ন্যায্য সুবিধা পাক। কিন্তু চাপ ও দুর্নাম নিতে পারছি না। আমি চাই এই বদলি আদেশ বাতিল হোক।”

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, “তেমন রাজনৈতিক চাপ নয়, কিছু সুপারিশ ছিল। বড় ধরনের কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে বদলি আদেশ বাতিল করা হবে।”

বদলি প্রক্রিয়ায় নীতিমালা অনুসরণ, আবেদনকারীদের জ্যেষ্ঠতা এবং শূন্য পদের তালিকা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না—এ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, বড় ধরনের অনিয়ম প্রমাণিত হলে বদলি আদেশ বাতিলের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর