শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ডেঙ্গু-হাম রুবেলা ওয়ার্ডে ময়লার স্তূপ, নেই পর্যাপ্ত মশারি

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ শুক্রবার, ২ অক্টোবর, ২০২৬

কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নার, কেবিন ও বারান্দাজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়লেও রোগীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত মশারির ব্যবস্থা। একই অবস্থা হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা হাম-রুবেলা কেন্দ্রেও। সেখানে নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে রোগীদের।

রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, হাসপাতালের এমন অব্যবস্থাপনার কারণে চিকিৎসা নিতে এসে উল্টো ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ১৪ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি রয়েছেন। গত সেপ্টেম্বর মাসে হাসপাতাল থেকে ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিয়েছেন ১২৭ জন। অন্যদিকে, আইসোলেশন ওয়ার্ডে থাকা হাম-রুবেলা কেন্দ্রে বর্তমানে উপসর্গ নিয়ে ২০ জন রোগী ভর্তি আছেন। চলতি মাসে ওই কেন্দ্র থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন ১৬৪ জন।

সরেজমিনে হাসপাতালের ডেঙ্গু কর্নার ও সাধারণ কেবিনের বারান্দায় বিভিন্ন স্থানে ময়লা-আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার উত্তরের ডেঙ্গু কেবিনের পশ্চিম পাশের বারান্দায় ময়লার স্তূপ পড়ে রয়েছে। এর কাছেই রোগী ও স্বজনদের অবস্থান করতে দেখা গেছে। উত্তর ও দক্ষিণের দুটি ডেঙ্গু কেবিনের কোনো শয্যাতেই মশারি টানানো ছিল না।

রোগীর স্বজনদের অভিযোগ, গুরুতর অসুস্থ রোগীদের এক স্থান থেকে অন্যত্র নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় হুইলচেয়ার কিংবা ট্রলি সময়মতো পাওয়া যায় না। আবার একজন রোগীর সঙ্গে একাধিক স্বজন বা দর্শনার্থী ওয়ার্ডে ঢুকে পড়ায় সবসময়ই ভিড় লেগে থাকে।

হাসপাতালের পুরোনো অংশে থাকা আইসোলেশন ওয়ার্ডের হাম-রুবেলা কেন্দ্রের চিত্রও একই রকম। নোংরা ও দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশে সেখানে উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীদের থাকতে হচ্ছে। স্বজনদের অভিযোগ, সংক্রামক রোগীদের জন্য নির্ধারিত এই কেন্দ্রে এমন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ রোগীদের সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে আরও অসুস্থ করে তুলছে।

কুড়িগ্রাম জেলা শহরের খলিলগঞ্জ এলাকার খেজুরতলা এলাকার এক রোগীর স্বজন মোছাঃ তানজিনা খাতুন বলেন, “রোগীকে ভর্তি করার সময় কোনো হুইলচেয়ার বা ট্রলি পাইনি। সিস্টার-ব্রাদারদের অনুরোধ করেও কোনো লাভ হয়নি। অনেক কষ্ট করে রোগীকে ওপরে তুলতে হয়েছে।”

সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়ন থেকে হাম-রুবেলা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা ৩ বছর বয়সী রোগী মোরসালিনের চাচা মো. সাজেদুল মিয়া বলেন, “দুপুরে রোগীকে ভর্তি করেছি। এখনো ডাক্তার দেখেননি, নার্সরা দেখভাল করছেন। সব ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। এখানকার পরিবেশ নোংরা। বাথরুমগুলোও ব্যবহার করার মতো নয়।”

ঢাকায় গার্মেন্টসে কাজ করা রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান ইউনিয়নের পালপাড়া এলাকার শফিকুলের স্ত্রী মোছাঃ মমতাজ বেগম (২৮) বলেন, “আমি ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে তিন দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ডাক্তার দেখাই। এখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আমি হাম-রুবেলায় আক্রান্ত হয়েছি।”

সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়ন থেকে রোগী নিয়ে হাসপাতালে আসা মোছাঃ আছমা বেগম বলেন, “হাসপাতালে রোগী নিয়ে এলে ট্রলি পাওয়া যায় না। পরিবেশ নোংরা, ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়। ঠিকমতো ডাক্তারও দেখেন না। আমরা এখন কোথায় যাব? এখানে ডেঙ্গু রোগীর সঙ্গে অন্য রোগীকেও রাখা হয়েছে।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দায়িত্বে থাকা এক নার্স জানান, ওই দিন হাম-রুবেলায় আক্রান্ত তিনজন রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। নানজিদা নামে সাড়ে সাত মাস বয়সী একটি শিশুকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে। বর্তমানে কেন্দ্রে ২০ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু জেলা সদর হাসপাতাল নয়, জেলার উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও ডেঙ্গু ও হাম-রুবেলার প্রকোপ বেড়েছে। বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্তমানে ২৭ জন ডেঙ্গু রোগী এবং ১৪২ জন হাম-রুবেলা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এছাড়া গত সেপ্টেম্বর মাসে উপজেলার স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে আরও ৪৯৭ জন রোগী হাম-রুবেলার উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিতে এসেছিলেন।

এদিকে হাম-রুবেলা প্রতিরোধে স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষ থেকে টিকাদান কার্যক্রমও চলছে। কুড়িগ্রাম জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ক্যাম্পেইন-পরবর্তী সময়ে জেলার স্থায়ী ও অস্থায়ী কেন্দ্রগুলোতে ৫৩ হাজার ৩৭৪ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত জেলায় সর্বমোট ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৩৭ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতালের সামগ্রিক অব্যবস্থাপনা ও চিকিৎসক সংকটের বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. নুর নেওয়াজ আহমেদ বলেন, “প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে চিকিৎসাসেবা দিতে আমরা হিমশিম খাচ্ছি। ২৫০ শয্যার হাসপাতালের জন্য ১৭৭ জন চিকিৎসক প্রয়োজন। সেখানে চিকিৎসক রয়েছেন মাত্র ১৯ জন।”

তিনি বলেন, “নাইট ডিউটি, বহির্বিভাগে দায়িত্ব, অপারেশনে যুক্ত থাকা এবং ময়নাতদন্তের জন্য বাইরের শিফটে কাজ করার কারণে চিকিৎসকেরা কোনো বিশ্রাম পান না। স্বল্পসংখ্যক চিকিৎসক নিয়ে টানা কাজ করা হচ্ছে। আমরা যতটা পারছি সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি।”

কুড়িগ্রাম জেলার সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস বলেন, “জেলায় ডেঙ্গু এবং হাম-রুবেলা রোগীর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ কাজ করছে। মানুষকে সচেতন করতে বিভিন্ন ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে।”

তিনি জানান, ক্যাম্পেইন-পরবর্তী সময়ে জেলার স্থায়ী ও অস্থায়ী টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে ৫৩ হাজার ৩৭৪ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত জেলায় ৩ লাখ ৩৪ হাজার ১৩৭ জনকে টিকা দেওয়া হয়েছে।

নানা অভিযোগ ও সংকটের মধ্যেই কুড়িগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা চলছে। সরকারি এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে সুস্থ হওয়ার পরিবর্তে নতুন করে রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা করছেন রোগী ও স্বজনেরা। দ্রুত অব্যবস্থাপনা দূর করে হাসপাতালের পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবার মান উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর