শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পঁচা সুপারিতেই ভাগ্য বদল, তৈরি হয়েছে শিল্পপণ্যের কাঁচামাল

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কুড়িগ্রামের রাজারহাটে একসময় গাছ থেকে ঝরে পড়ে পচে যাওয়া সুপারি ছিল কৃষকের কাছে মূল্যহীন। সেই পরিত্যক্ত সুপারি এখন সংগ্রহ, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী ও হকাররা। এ ব্যবসাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থান, আয় করছেন স্থানীয় প্রান্তিক নারী-পুরুষ।

কুড়িগ্রামের বিভিন্ন গ্রামের হকাররা বসতবাড়ির আঙিনা ও বাগান থেকে ঝরে পড়া পচা সুপারি সংগ্রহ করে রোদে শুকিয়ে হাটে নিয়ে আসেন। রাজারহাট উপজেলার দিনোবাজারে নিয়মিত বসছে শুকনো পচা সুপারির পাইকারি বাজার। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু এ বাজারেই ১১ জন ব্যবসায়ী এ ধরনের সুপারি কেনাবেচার সঙ্গে যুক্ত। তারা প্রতি মাসে হকারদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ টন সুপারি সংগ্রহ করেন।

মানভেদে প্রতি কেজি ৬০ থেকে ১০০ টাকা দরে এসব সুপারি কেনার পর পরিষ্কার ও বাছাই করা হয়। পরে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পাঠানো হয়। ব্যবসায়ীদের দাবি, প্রক্রিয়াজাত এসব সুপারি বাণিজ্যিক রং প্রস্তুতকারী কারখানাসহ বিভিন্ন রাসায়নিক শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ১ হাজার ২৬৫ হেক্টর জমিতে সুপারি বাগান রয়েছে। মূল ফলনের পাশাপাশি ঝরে পড়া সুপারি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ফলে অপচয় কমার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে বিকল্প আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

দিনোবাজারে সুপারি শুকানো, বাছাই ও প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে শতাধিক শ্রমিক যুক্ত রয়েছেন বলে ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী। এছাড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় আরও অর্ধশতাধিক মানুষ এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন।

রাজারহাটের ব্যবসায়ী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৫০ টন পচা সুপারি দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠান। এতে তাঁর মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিট লাভ হয়। তাঁর সঙ্গে কাজ করা শ্রমিকদেরও নিয়মিত আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ব্যবসায়ী সুজা মিয়া বলেন, বছরের প্রায় ছয় মাস এই ব্যবসা চলে। আগে তিনি বেকার ছিলেন। এ ব্যবসা শুরু করার পর তাঁর আয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

আরেক ব্যবসায়ী লাভলু মিয়া বলেন, “এই ব্যবসার মাধ্যমে আমি নিজে যেমন উপার্জন করছি, তেমনি এলাকার প্রায় ১০০ জন শ্রমিকের কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে।”

স্থানীয় নারী শ্রমিক সাগরিকা বলেন, “আগে কাজের খোঁজে বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো। এখন বছরের প্রায় ছয় মাস এখানে কাজ পাই। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করতে পারছি, যা সংসার চালাতে সহায়তা করছে।”

ছাটবান্ধা এলাকার শ্রমিক রেণুবালা বলেন, “আগে বসে থাকতাম। এখন সুপারি বাছাই ও শুকানোর কাজ করে দিনে ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা মজুরি পাই। এতে সংসারে সহায়তা হচ্ছে।”

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, এ খাতকে আরও সম্প্রসারণ করতে প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক শুকানোর প্রযুক্তি প্রয়োজন। তাদের মতে, আধুনিক ড্রায়ারসহ প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এ খাতের বাণিজ্যিক পরিসর আরও বাড়তে পারে।

রাজারহাট উপজেলা অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা হৈমন্তী রানী বলেন, “যে সুপারি একসময় ফেলনা ছিল, তা এখন বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি করেছে। এই প্রক্রিয়াজাত ব্যবসার সঙ্গে কৃষক, ব্যবসায়ী ও শ্রমিক—সবাই যুক্ত হচ্ছেন।”

তিনি জানান, বর্তমানে এ খাত সম্প্রসারণে তাঁদের দপ্তরের হাতে নতুন কোনো সরকারি প্রকল্প বা পরিকল্পনা নেই।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর