বুধবার, ২৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৫৯ অপরাহ্ন

ভরা মৌসুমেও চড়া ইলিশের দাম, হতাশ জেলে-ক্রেতা

বাগেরহাট প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬

ভরা মৌসুমেও বাজারে ইলিশের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। সংকটের কারণে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে জাতীয় মাছটি। এতে একদিকে যেমন সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে ইলিশ, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত মাছ না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরছেন অনেক জেলে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভরা মৌসুমের প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও নদী ও সাগর থেকে প্রত্যাশিত পরিমাণ ইলিশ আসছে না। বাজারে যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তার বড় অংশই আকারে তুলনামূলক ছোট। সরবরাহ কম থাকায় দামও রয়েছে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে।

মৎস্য বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নদীতে নাব্যতা কমে যাওয়া, পানি দূষণ, প্রজনন পরিবেশ নষ্ট হওয়া এবং জাটকা নিধনের কারণে ইলিশের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

মৎস্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ দশমিক ৩২ লাখ টন। পরবর্তী কয়েক বছরে উৎপাদন বেড়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৭১ লাখ টনে পৌঁছায়। তবে এরপর উৎপাদন কমতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশ আহরণ নেমে আসে ৫ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরও কমে প্রায় ৫ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।

শুধু উৎপাদন নয়, ইলিশের আকারও ছোট হয়ে আসছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। বাংলাদেশ মৎস্য বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক ও ইলিশ গবেষক আনিসুর রহমানের মতে, একসময় ইলিশের গড় ওজন ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রামের মধ্যে থাকলেও বর্তমানে তা অনেক ক্ষেত্রে ৩০০ থেকে ৩৫০ গ্রামে নেমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নদীদূষণ, নাব্যতা সংকট এবং ইলিশের প্রজননস্থলের পরিবেশের পরিবর্তন এর অন্যতম কারণ। এসব সমস্যা মোকাবিলায় নদী ও জলজ পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

খুলনা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. বদরুজ্জামান বলেন, একটি ইলিশ পরিপূর্ণ আকারে পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হয়। নদীতে জন্ম নেওয়ার পর ছোট ইলিশ সাগরে যায় এবং পরিণত হলে আবার মিঠাপানির নদীতে ফিরে আসে। অতিরিক্ত মাছ শিকার ও নিষিদ্ধ জালের ব্যবহার ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্রকে বাধাগ্রস্ত করছে।

তিনি আরও জানান, মোহনায় নিষিদ্ধ জাল, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, শিল্পবর্জ্যের দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণ নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করছে। পাশাপাশি সাগরে মা ইলিশ ও জাটকা শিকারও বড় ইলিশের সরবরাহ কমিয়ে দিচ্ছে।

এদিকে বাজারে ইলিশের দাম নিয়েও ক্ষোভ জানিয়েছেন ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, এক কেজি ইলিশের দাম প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা হওয়ায় সাধারণ পরিবারের পক্ষে তা কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। ভরা মৌসুমেও দাম না কমায় অনেকেই ইলিশ কেনার সিদ্ধান্ত থেকে সরে যাচ্ছেন।

খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, জেলেদের কাছ থেকে মাছ সংগ্রহের পর কয়েক ধাপে হাতবদলের কারণে দাম বাড়ছে। এর সঙ্গে দাদন, বরফ, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ এবং ব্যবসায়ীদের মুনাফা যুক্ত হচ্ছে। সরবরাহ কম থাকায় বাজারে দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে বলে জানান তারা।

ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ জানান, সরবরাহ সংকটের কারণে আগের মৌসুমে সংরক্ষণ করা হিমায়িত ইলিশও বাজারে ছাড়া হচ্ছে। বর্তমানে বাজারভেদে ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রামের ছোট ইলিশ ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা, এক কেজির মাছ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় ৪ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

দীর্ঘদিন হিমায়িত করে রাখা ইলিশের মান নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করলে মাছের গুণগত ও পুষ্টিমান কমে যেতে পারে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা হলে তা ভোক্তার স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ইলিশ সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের সরকারি মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতেও। বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএফডিসি) আওতাধীন বিভিন্ন কেন্দ্রের অনেকগুলোতে কার্যক্রম সীমিত হয়ে পড়েছে। খুলনা মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরের তুলনায় চলতি মৌসুমে সেখানে ইলিশের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত কেন্দ্রটিতে মাত্র প্রায় দেড় হাজার কেজি ইলিশ এসেছে। অথচ ২০২২ সালের একই সময়ে এসেছিল ৩৮ হাজার ৫৪৬ কেজি, ২০২৩ সালে ১৫ হাজার ৯৭৬ কেজি এবং ২০২৪ সালে ৮ হাজার ৩৯১ কেজি।

দেশের অন্যান্য বড় মাছের মোকামেও ইলিশের সরবরাহ কমে যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে জেলে, আড়তদার, ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—সব পক্ষের ওপরই এর প্রভাব পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে অভয়াশ্রমগুলো কার্যকরভাবে সংরক্ষণ, জাটকা ও মা ইলিশ শিকার বন্ধ, নিষিদ্ধ ট্রলিং ও জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং নদীর পরিবেশ রক্ষা জরুরি। পাশাপাশি জেলেদের তালিকা হালনাগাদ করে প্রকৃত জেলেদের যথাযথ সহায়তা নিশ্চিত করা এবং সংশ্লিষ্ট আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর