সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইউরোপে সেনা উপস্থিতি কমাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

এইবাংলা অনলাইন
  • প্রকাশকালঃ রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

নিজেদের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রাণালয় (পেন্টাগন) ইউরোপে থাকা সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম কমানোর কয়েকটি বিকল্প নিয়ে আলোচনা করছে বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে ইউরোপের মিত্রদেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার পর এই আলোচনা সামনে এসেছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যে পেন্টাগনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী পিট হেগসেথের কাছে পরিকল্পনা জমা দিতে পারে।

বর্তমানে ইউরোপে অন্তত ৬৮ হাজার মার্কিন সেনা রয়েছে। এদের মধ্যে এক তৃতীয়াংশ সেনা সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে জার্মান, ইতালি ও স্পেনে থাকা মার্কিন সেনাদের ওপর বেশি প্রভাব পড়তে পারে। আরও বড়ো পরিসরে একটি পরিকল্পনায় প্রায় ৪০ হাজার সেনা সরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সামরিক বিমান, যুদ্ধজাহাজ ও অস্ত্র ইউরোপ থেকে প্রত্যাহার করা হতে পারে। তবে আরেকটি বিকল্প হিসেবে পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপ থেকে কিছু সেনা সরিয়ে ন্যাটোর পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে মোতায়ন করার কথাও ভাবা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র কি ইতোমধ্যে ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে ফেলেছে?

গত বছরে দুই হাজারের মতো মার্কিন সেনা রোমানিয়া থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এছাড়া পাঁচ হাজার সেনা জার্মানি থেকে সরিয়ে ফেলার প্রস্তুতি চলছে। ইউরোপে থাকা মার্কিন সেনাদের অর্ধেকের বেশি জার্মানিতে অবস্থান করছে।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের সমালোচনা করার পর মে মাসে তাদের প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে। সে সময় ট্রাম্প আরও বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, তৎকালীন হোয়াইট হাউসকে জার্মানি থেকে অন্তত ২৫ হাজার সেনা প্রত্যাহার করা থেকে বিরত রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।

ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিপুলসংখ্যক সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম সরিয়ে নেওয়া হলে এর তাৎপর্য হবে বড়। এতে মহাদেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন জার্মান মার্শাল ফান্ডের বিশ্লেষক ইয়ান লেসার।

তবে রাশিয়া ন্যাটোর সদস্য কোনো দেশে হামলা চালাবে এমন সম্ভাবনা খুব বেশি নয়। তারপরও এ ধরনের পরিস্থিতি মস্কোকে নিশ্চিতভাবেই কিছু কৌশলগত সুবিধা এনে দেবে বলে মনে করেন তিনি।

লেসার বলেন, তবে সেনা কোথা থেকে এবং কখন সরানো হচ্ছে, তার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তার মতে, এখনই ইউরোপের ওপর এর প্রভাব কতটা হবে, তা নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, পশ্চিম ইউরোপ থেকে মার্কিন সেনাদের পূর্বাঞ্চলীয় ন্যাটো সীমান্তে সরিয়ে নেওয়া হলে সেটি হয়তো উদ্বেগের কারণ হবে না। কারণ জার্মানি ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোও দ্রুত নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে।

তবে ইউরোপ থেকে সেনা সরিয়ে নিলে যুক্তরাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ এতে ইউরোপজুড়ে দ্রুত সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও অভিযান পরিচালনার সক্ষমতা কমে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টির জ্যেষ্ঠ নেতারাও এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

জার্মানি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরুর পর এক যৌথ বিবৃতিতে সিনেটর রজার উইকার ও প্রতিনিধি মাইক রজার্স বলেন, এ পদক্ষেপ রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে ভুল বার্তা দিতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্ক কেন খারাপ হচ্ছে?

ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদ থেকেই ইউরোপের ন্যাটো সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে আসছেন যে, জোটটির আর্থিক বোঝার বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হচ্ছে।

গত জানুয়ারিতে ট্রাম্প বলেন, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলোর উচিত প্রতিরক্ষা খাতে তাদের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ ব্যয় করা। তবে অনেক ন্যাটো সদস্যই এখনো বর্তমান ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হিমশিম খাচ্ছে।

এর মধ্যে ন্যাটোর সদস্যদেশগুলো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা ব্যয় জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করতে ইতিমধ্যে সম্মত হয়েছে। তবে ট্রাম্পের অসন্তোষ আরও বাড়িয়েছে ইরান নিয়ে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধে ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থান। ইউরোপের দেশগুলো মার্কিন বাহিনীকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ দিয়ে এই যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। স্পেন ও ইতালির মতো কয়েকটি দেশ ওয়াশিংটনের ইরান বিষয়ক যুদ্ধনীতির প্রকাশ্য সমালোচনাও করেছে।

আরেকটি বড় বিরোধের জায়গা হলো শুল্ক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল পরিমাণ পণ্য রপ্তানি করে। কিন্তু ট্রাম্প গত বছর তার বাণিজ্যযুদ্ধের অংশ হিসেবে ইউরোপ থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেন। এ ছাড়া গত এক বছরে গ্রিনল্যান্ড নিয়েও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।

শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, গ্রিনল্যান্ড ও ডেনমার্কের সঙ্গে তিনি একটি নতুন চুক্তিতে পৌঁছেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই চুক্তির ফলে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা ও অন্যান্য সব প্রয়োজনের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আসবে। এর ফলে অঞ্চলটির প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের সুযোগও যুক্তরাষ্ট্র পেতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

সূত্র: আল জাজিরা।

এই সম্পর্কিত আরো খবর