রবিবার, ০৯ অগাস্ট ২০২৬, ১০:৫৯ পূর্বাহ্ন

শূকরের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপিত প্রথম রোগীর মৃত্যু, অঙ্গটিতে প্রাণীবাহিত ভাইরাসের অস্তিত্ব মেলায় চাঞ্চল্য

এইবাংলা অনলাইন
  • প্রকাশকালঃ সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

 

চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শূকরের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন করা ব্যক্তিটি ঠিক কী কারণে মারা গিয়েছিলেন—তা অনুসন্ধান করতে গিয়ে এক অপ্রত্যাশিত তথ্যের মুখোমুখি হয়েছেন গবেষকরা। তারা জানিয়েছেন, প্রতিস্থাপিত অঙ্গটিতে একটি প্রাণীবাহিত ভাইরাসের ডিএনএ পাওয়া গেছে। তবে রোগীর চিকিৎসায় যুক্ত চিকিৎসকরা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না, এই ভাইরাসের কারণেই তার মৃত্যু হয়েছে নাকি অন্য কোনো কারণ ছিল।

চলতি বছরের মার্চ মাসে, এই যুগান্তকারী পরীক্ষামূলক অস্ত্রোপচারের মাত্র দুই মাস পর ৫৭ বছর বয়সী ডেভিড বেনেট সিনিয়র শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের চিকিৎসকরা সম্প্রতি জানান, হৃৎপিণ্ডটির ভেতরে ‘পোরসিন সাইটোমেগালোভাইরাস’ (Porcine Cytomegalovirus) নামের একটি পশুর ভাইরাসের ডিএনএ পাওয়া গেছে। তবে এটি সক্রিয় কোনো সংক্রমণ তৈরি করছিল—এমন স্পষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

পশু থেকে মানুষের দেহে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের (যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘জেনোট্রান্সপ্ল্যান্টেশন’ বলা হয়) ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি ও দুশ্চিন্তার কারণ হলো, এর মাধ্যমে মানুষের শরীরে অচেনা ও নতুন ধরনের প্রাণীবাহিত রোগের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বেনেটের অস্ত্রোপচারকারী প্রধান সার্জন ড. বার্টলি গ্রিফিত বার্তা সংস্থা এপি-কে বলেন, “কিছু ভাইরাস শরীরে কোনো রোগ বা লক্ষণ সৃষ্টি না করে সুপ্ত অবস্থায় (Latent) লুকিয়ে থাকে। এটিও হয়তো তেমনই কোনো ‘বিনামূল্যের যাত্রী’ হিসেবে ছিল।”

বিশ্ববিদ্যালয়টির জেনোট্রান্সপ্লান্ট প্রোগ্রামের বৈজ্ঞানিক পরিচালক ড. মুহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, “ভবিষ্যতে যাতে এই ধরনের ক্ষতিকারক ভাইরাস কোনোভাবেই নজর এড়িয়ে না যায়, তা নিশ্চিত করতে আমরা আরও উন্নত ও সংবেদনশীল পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা তৈরি করছি।”

‘এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ’-তে প্রথম এই ভাইরাসের উপস্থিতির কথা প্রকাশিত হয়, যা পরবর্তীতে আমেরিকান সোসাইটি অব ট্রান্সপ্লান্টেশনে উপস্থাপন করেন ড. গ্রিফিত।

দৈনিক এই বাংলার সর্বশেষ খবর পেতে Google News অনুসরণ করুন

কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা মানুষের জীবন বাঁচাতে প্রাণীর অঙ্গ ব্যবহার করার চেষ্টা চালালেও ইতিপূর্বে সফলতা পাননি। মৃত্যুর মুখে থাকা বেনেট সাধারণ মানুষের হৃৎপিণ্ড পাওয়ার জন্য উপযুক্ত ছিলেন না। তাই বাধ্য হয়ে চিকিৎসকরা শেষ চেষ্টা হিসেবে জিনগতভাবে পরিবর্তিত এক শূকরের হৃৎপিণ্ড তার দেহে বসান, যাতে বেনেটের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা (ইমিউন সিস্টেম) অ অঙ্গটিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান না করে।

প্রতিষ্ঠানটির চিকিৎসকরা দাবি করেছেন, অঙ্গদাতা শূকরটি সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল এবং মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এফডিএ) সমস্ত সুরক্ষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। এটি লালন-পালনও করা হয়েছিল সংক্রমণমুক্ত বিশেষ এক পরিবেশে। তবে শূকরটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘রেভিভিকোর’ এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

ড. গ্রিফিত জানান, অস্ত্রোপচারের পর বেনেট ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু হঠাৎ একদিন সকালে তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং শরীরে মারাত্মক সংক্রমণের উপসর্গ দেখা দেয়। চিকিৎসকরা অসংখ্য পরীক্ষা চালিয়ে তাকে অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিভাইরাল ও ইমিউন-বুস্টিং থেরাপি দেন। তবে কোনো চেষ্টা সফল হয়নি; শূকরের হৃৎপিণ্ডটি ফুলে যায়, পানিতে ভরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত সচল থাকার ক্ষমতা হারায়।

হৃৎপিণ্ডের এই অস্বাভাবিক ফোলাভাবের পেছনে ভাইরাসের কোনো ভূমিকা ছিল কি না—এমন প্রশ্নে ড. গ্রিফিত বলেন, “সত্যি বলতে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। তবে রোগীর অঙ্গ প্রত্যাখ্যানের (Organ Rejection) যে স্বাভাবিক লক্ষণ থাকে, এটি তেমন ছিল না।”

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য গবেষণা কেন্দ্রেও পশুর অঙ্গ নিয়ে গবেষণা চলছে। তবে প্রথম জীবিত রোগীর শরীরে এই ভাইরাসের উপস্থিতি প্রকাশ পাওয়ার পর, ভবিষ্যতের অন্যান্য প্রতিস্থাপন পরিকল্পনায় এর কী প্রভাব পড়বে তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এই বাংলা/এমএস

 

এই সম্পর্কিত আরো খবর