বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

গরু-লাঙলের চাষাবাদ হারিয়ে যাচ্ছে, ঐতিহ্য আঁকড়ে ডিমলার বনমালী

ডিমলা (নীলফামারি) প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সময়ের পরিবর্তন ও আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির বিস্তারে নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে গরু-লাঙলনির্ভর চাষাবাদের ঐতিহ্য। একসময় লাঙল, জোয়াল, বলদ ও মহিষ ছিল গ্রামীণ কৃষকের নিত্যদিনের সঙ্গী। আধুনিক কৃষিযন্ত্রের দাপটে সেই চেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীতের স্মৃতি। তবে এখনও ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে জমি চাষ করে সেই স্মৃতি ধরে রেখেছেন উপজেলার কয়েকজন কৃষক।

তাঁদেরই একজন দক্ষিণ তিতপাড়া ঝেল্লাপাড়া গ্রামের ৭০ বছর বয়সী বনমালী রায়। বয়সের ভারে ন্যুব্জ হলেও এখনও গরু ও লাঙল দিয়ে জমি চাষ করেন তিনি। অবশ্য আগের মতো বিস্তীর্ণ জমিতে নয়, বর্তমানে সামান্য কিছু জমিতেই এই পদ্ধতি ব্যবহার করেন বনমালী।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশি ও নব্বইয়ের দশকে ডিমলার গ্রামীণ কৃষিজীবনে গরু-লাঙলের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। অনেক কৃষকের বাড়িতেই ছিল এক বা একাধিক জোড়া বলদ। ভোর হওয়ার আগেই কৃষকেরা গরুর ঘাড়ে জোয়াল তুলে মাঠের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তেন। দিনভর জমিতে হালচাষ শেষে সূর্যাস্তের পর ক্লান্ত শরীরে বাড়ি ফিরতেন।

তখন কৃষিকাজে গবাদিপশুর গোবর সার হিসেবে ব্যবহারের প্রচলনও ছিল। জমির উর্বরতা ধরে রাখতে কৃষকেরা বিভিন্ন প্রাকৃতিক উপকরণের ওপর নির্ভর করতেন। গরু পালন, লাঙল তৈরি, জোয়াল বানানো এবং হালচাষকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল গ্রামীণ জীবনের নানা রীতি ও সংস্কৃতি।

দক্ষিণ তিতপাড়া ঝেল্লাপাড়া গ্রামের আবুল হাসেম (৬৫) বলেন, “গরু দিয়ে লাঙল চাষ আমাদের অতীতের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে রেখেছে। এখন সেই সময়ের কথা মনে পড়লে অসহায় লাগে। আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহারে আমাদের সেই দিনের অনেক স্মৃতিই হারিয়ে গেছে।”

আরেক কৃষক মো. ফজলু ঘাটু (৭৭) নিজের বাড়িতে যত্ন করে রাখা পুরোনো লাঙল, মইসহ বিভিন্ন কৃষি সরঞ্জাম দেখান। একটি বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে তিনি বলেন, “এটাকে আমরা পেন্টি বলতাম। এটা দিয়ে গরুকে সংকেত দেওয়া বা তাড়িয়ে নিজেদের মতো করে চাষ করানো হতো। এখনকার ছেলেরা হয়তো এসব দেখেইনি।”

তবে সময়ের সঙ্গে কৃষিতে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। পাওয়ার টিলার, ট্রাক্টরসহ আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় কম সময়ে ও তুলনামূলক কম শ্রমে জমি চাষ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে গরু-লাঙলের প্রয়োজনীয়তা কমে এসেছে। ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এই কৃষিপদ্ধতি।

বয়োজ্যেষ্ঠ কৃষকদের ভাষ্য, আধুনিক কৃষিযন্ত্র কৃষিকাজের গতি বাড়িয়েছে এবং সময় ও শ্রম সাশ্রয় করেছে। তবে এর সঙ্গে গ্রামীণ কৃষিজীবনের অনেক পুরোনো রীতি ও চর্চাও হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় মাঠে মাঠে শোনা যেত লাঙলের শব্দ, কৃষকের হাঁকডাক আর রাখালের সুর। এখন সেই দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না।

বনমালী রায়ের মতো কয়েকজন কৃষক এখনও গরু-লাঙলের চাষাবাদ ধরে রেখেছেন। তবে এটি এখন আর ডিমলার প্রধান কৃষিপদ্ধতি নয়। আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার পাশাপাশি গ্রামবাংলার পুরোনো কৃষিসংস্কৃতির এই নিদর্শনও ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ফলে গরু-লাঙলের চাষাবাদ আজ শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি নয়, বরং ডিমলার গ্রামীণ জীবনের হারিয়ে যাওয়া এক স্মরণীয় অধ্যায়।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর