কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দুধকুমার নদীর তীরে জন্ম নেওয়া কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সাংবাদিক আবদুল হাই শিকদার বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতিচর্চায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা, শিশুসাহিত্য, ভ্রমণ, সম্পাদনা ও টেলিভিশন—সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গনে রয়েছে তাঁর বিস্তৃত পদচারণা।
নজরুলচর্চায় বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁর অর্জনের তালিকায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে আরও একটি সম্মাননা। ‘নজরুল পদক ২০২৬’-এর গবেষণা বিভাগে নির্বাচিত হয়েছেন কবি আবদুল হাই শিকদার। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি ১৯ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে এ পদকের জন্য নির্বাচিত করে। একই বছর সংগীত বিভাগে পদকের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন নজরুলসংগীত শিল্পী শবনম মুশতারী।
আগামী ২৪ আগস্ট নজরুলজয়ন্তী উদযাপনের বিশেষ পর্বে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁদের হাতে এ সম্মাননা তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।
আবদুল হাই শিকদার ১৯৫৭ সালের ১ জানুয়ারি কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার দক্ষিণ ছাট গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দুধকুমার নদীর তীরে বেড়ে ওঠা এই সাহিত্যিকের বাবা ওয়াজেদ আলী এবং মা হালিমা খাতুন। শৈশব থেকেই সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়।
গ্রামের বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি ভূরুঙ্গামারী হাইস্কুল ও রংপুরের কারমাইকেল কলেজে পড়াশোনা করেন। পরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১৯৭৯ সালে বাংলায় স্নাতক (সম্মান) সম্পন্ন করেন। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৬ সালে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত হন আবদুল হাই শিকদার। ১৯৭৭ সালে ‘শাব্দিক সাহিত্যপত্র’ সম্পাদনার মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যসম্পাদনার পথচলা শুরু হয়। ১৯৮১ সালে ‘সাপ্তাহিক সচিত্র স্বদেশ’-এর মাধ্যমে পেশাগত সাংবাদিকতায় প্রবেশ করেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন জাতীয় সংবাদপত্র ও সংবাদ সংস্থায় প্রতিবেদক, সহকারী সম্পাদক ও ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ফিচার বিভাগের প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি।
ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হিসেবে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাংবাদিকতার পাশাপাশি টেলিভিশনেও রয়েছে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘কথামালা’ ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক, পরিকল্পনাকারী ও গ্রন্থনাকারী হিসেবে তিনি দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির নানা অনালোচিত অধ্যায় দর্শকদের সামনে তুলে ধরেন।
বাংলার বিভিন্ন কবি-সাহিত্যিক, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে তাঁর অনুসন্ধানী কাজ তাঁকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।
আবদুল হাই শিকদারের সাহিত্যকর্মের পরিধি বিস্তৃত। কবিতা, প্রবন্ধ, গল্প, গবেষণা, জীবনী, ভ্রমণকাহিনি, শিশুসাহিত্য ও সম্পাদনাসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবদান রয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক।
উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে—‘আশি লক্ষ ভোর’, ‘আগুন আমার ভাই’, ‘রেলিঙ ধরা নদী’, ‘মানব বিজয় কাব্য’, ‘এই বধ্যভূমি একদিন স্বদেশ ছিলো’, ‘লোডশেডিং নামিয়াছে’, ‘দুধকুমারের জানালাগুলি’, ‘সুন্দরবন গাথা’, ‘নির্বাচিত প্রেমের কবিতা’, ‘কসম’, ‘নদীর মেয়ে বাংলাদেশ’, ‘ইশক আবাদ’ ও ‘সিগারেট টানতে টানতে চলে যায়’।
তাঁর লেখায় দেশ, মানুষ, প্রকৃতি, স্বাধীনতা, ইতিহাস, জাতীয় পরিচয় ও মানবতার নানা দিক প্রতিফলিত হয়েছে।
সাহিত্যিক পরিচয়ের পাশাপাশি গবেষক হিসেবেও আবদুল হাই শিকদারের স্বতন্ত্র অবস্থান রয়েছে। বিশেষ করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও সম্পাদনাকর্ম উল্লেখযোগ্য।
নজরুলকে নিয়ে তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত কাজের মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশে নজরুল নজরুলের বাংলাদেশ’, ‘বাংলাদেশে নজরুল চর্চা: মুখোশ ও বাস্তবতা’, ‘জাতীয় কবি ও শহীদ জিয়া’, ‘নজরুল রচনায় পলাশী ট্রাজেডী’, ‘নজরুল রচনায় মোহররম’, ‘বিশ্বময় নজরুল’ এবং ‘নজরুল সাহিত্য: শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’সহ বিভিন্ন গ্রন্থ।
নজরুলচর্চায় তাঁর দীর্ঘদিনের গবেষণা ও অবদানের স্বীকৃতিই এবার ‘নজরুল পদক ২০২৬’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কমিটি গবেষণা বিভাগে তাঁকে এ সম্মাননার জন্য নির্বাচিত করেছে।
সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আবদুল হাই শিকদার বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সম্মাননা, নজরুলবিষয়ক বিভিন্ন পুরস্কার ও সাহিত্য পদকের কথা উল্লেখ করা হয়।
তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যিক ও গবেষণামূলক পথচলায় এবার যুক্ত হতে যাচ্ছে ‘নজরুল পদক ২০২৬’।
দুধকুমারের তীর থেকে উঠে এসে জাতীয় সাহিত্য ও সাংবাদিকতার অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন আবদুল হাই শিকদার। কবিতা ও গবেষণার পাশাপাশি সাংবাদিকতা, টেলিভিশন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে তাঁর দীর্ঘ পথচলা তাঁকে কুড়িগ্রামের অন্যতম পরিচিত কৃতী সন্তান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নজরুলচর্চায় গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে ‘নজরুল পদক ২০২৬’ অর্জনের মধ্য দিয়ে তাঁর বর্ণিল কর্মজীবনে যুক্ত হতে যাচ্ছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কুড়িগ্রামের মাটি থেকে উঠে আসা এই বহুমাত্রিক সাহিত্যিকের অর্জনে গর্বিত তাঁর জন্মভূমির মানুষও।
দুধকুমারের পাড় থেকে জাতীয় সাহিত্যাঙ্গন—আবদুল হাই শিকদারের দীর্ঘ পথচলা যেন কুড়িগ্রামের মেধা, মনন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরই এক উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি।
এই বাংলা/এমএস