সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬

কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি কলেজে শিক্ষক সংকট চরমে, ১৩ বিষয়ে নেই শিক্ষক

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬

কুড়িগ্রামের রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে শিক্ষক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ৬০টি অনুমোদিত শিক্ষকের পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ২৭ জন। শূন্য রয়েছে ৩৩টি পদ। এর মধ্যে ১৩টি বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। ফলে এক বিষয়ের শিক্ষককে অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে। এতে ব্যাহত হচ্ছে বিষয়ভিত্তিক পাঠদান। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি পর্যাপ্ত অ্যাকাডেমিক ভবন ও শ্রেণিকক্ষ না থাকায় জরাজীর্ণ টিনশেড ভবনে দুর্ভোগ নিয়ে ক্লাস করছে কলেজটির সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থী।

জানা গেছে, কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার একমাত্র সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে উচ্চমাধ্যমিকের পাশাপাশি ছয়টি বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু রয়েছে। শিক্ষক সংকটের কারণে অনার্সের পাঠদান, প্রশাসনিক কাজ ও অন্যান্য অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শিক্ষকদের উচ্চমাধ্যমিকের বিভিন্ন বিষয়ের ক্লাসও নিতে হচ্ছে। অন্য বিষয়ে অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা থাকায় কোনো কোনো শিক্ষক অতিরিক্ত ক্লাস নিতে পারলেও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষায়িত পাঠদান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালু রাখা সম্ভব হলেও কাঙ্ক্ষিত মানের বিষয়ভিত্তিক শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে।

কৃষি, গার্হস্থ্য ও মনোবিজ্ঞানসহ একাধিক বিষয়ে শিক্ষক না থাকায় পাঠদান কার্যক্রমে সমস্যা তৈরি হয়েছে। অতিথি শিক্ষক দিয়ে এই ঘাটতি পূরণের চেষ্টা করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। শিক্ষক সংকটের পাশাপাশি কলেজটিতে রয়েছে অবকাঠামোগত সমস্যাও।

পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ না থাকায় একই সময়ে সব বিভাগের ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পুরোনো টিনশেড ভবনের বিভিন্ন অংশও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। বর্ষাকালে ছাদ চুইয়ে শ্রেণিকক্ষে পানি পড়ে। এতে পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভোগান্তিতে পড়তে হয় শিক্ষার্থীদের।

২০১৮ সালের ৮ আগস্ট কলেজটি জাতীয়করণ করা হলেও এখনো প্রত্যাশিত উন্নয়ন হয়নি। শিক্ষার্থীদের দাবি, দ্রুত শূন্য পদগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি জরাজীর্ণ শ্রেণিকক্ষ সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ করতে হবে।

কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. লাল মিয়া বলেন, “আমরা খুব কষ্ট করে এই ভবনে পড়াশোনা করছি। আমাদের সরকারি কোনো ভালো ভবন নেই। অ্যাকাডেমিক ভবনের অবস্থাও খুব খারাপ। বর্ষাকালে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। এতে ক্লাস করতে অসুবিধা হয়।”

একই শ্রেণির শিক্ষার্থী মোছা. মাস্তুমা আক্তার বলেন, “কৃষি, গার্হস্থ্য, মনোবিজ্ঞানসহ অনেক বিষয়ে আমাদের কলেজে শিক্ষক নেই। শিক্ষক না থাকায় আমরা ঠিকমতো ক্লাস করতে পারছি না। এতে পাঠদান অনেক ব্যাহত হচ্ছে।”

ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান মোছা. মিনারা বেগম বলেন, “আমাদের ১৩টি বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। সরকারের কাছে আবেদন, ক্যাডার বা নন-ক্যাডার—যেভাবেই হোক, দ্রুত এখানে শিক্ষকের ব্যবস্থা করা হোক। সাধারণ শিক্ষক হিসেবে আমাদের অন্য বিষয়ের ক্লাস নিতে হচ্ছে, যা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”

হিসাববিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক মো. যাবের ইবনে হুদা বলেন, “১৩টি বিষয়ে কোনো শিক্ষক নেই। হিসাববিজ্ঞান বিভাগের পাশাপাশি আমাকে পরিসংখ্যান ও অর্থনীতি বিষয়েও ক্লাস নিতে হচ্ছে। এ দুটি বিষয়ে অনার্সে পড়াশোনা ছিল বলে ক্লাস নিতে পারছি। কিন্তু বিষয় দুটিতে বিশেষায়িত শিক্ষা দিতে পারছি না। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেন স্থবির হয়ে না পড়ে, সে জন্য আপাতত ক্লাস চালিয়ে যাচ্ছি।”

দর্শন বিভাগের বিভাগীয় প্রধান তপতী রায় বলেন, “এখানে ছয়টি বিভাগে অনার্স চালু রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের শিক্ষকদের অনার্সের দায়িত্ব পালন করতে হয় এবং সেখানেই ব্যস্ত থাকতে হয়। ফলে উচ্চমাধ্যমিক স্তর থেকে শুরু করে অন্যান্য বিষয়ের পাঠদানের দিকে যথাযথভাবে নজর দেওয়া সম্ভব হয় না।”

কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, “সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজে সাড়ে তিন হাজার শিক্ষার্থীর বিপরীতে অনুমোদিত ৬০টি শিক্ষকের পদের মধ্যে ৩৩টি শূন্য রয়েছে। কর্মরত আছেন ২৭ জন। কলেজে শিক্ষক ও কর্মচারী সংকট রয়েছে। পাশাপাশি নেই পর্যাপ্ত অ্যাকাডেমিক ভবন। বিজ্ঞান বিষয়েরও কোনো শিক্ষক নেই। আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত সমস্যাগুলোর সমাধান করবে।”

এই সম্পর্কিত আরো খবর