সুন্দরবনের দক্ষিণ উপকূলে বঙ্গোপসাগরের তীরঘেঁষে অবস্থিত দুবলার চর। প্রতি বছর শুঁটকি উৎপাদন, হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান এবং ঐতিহ্যবাহী রাসমেলাকে কেন্দ্র করে এলাকাটি অর্থনৈতিক ও পর্যটন কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। তবে বিপুল রাজস্ব আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হলেও সেখানে কর্মরত মানুষের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি দুবলার চরে অব্যবস্থাপনার চিত্রও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
সুন্দরবনের দক্ষিণ উপকূলের এই মৌসুমি জনপদে সাধারণত অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত শুঁটকি উৎপাদনের কার্যক্রম চলে। মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরের এই চরে খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে জেলে, ব্যবসায়ী ও শ্রমিকেরা এসে অস্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। মাছ আহরণ, বাছাই, শুকানো, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনকে ঘিরে সেখানে গড়ে ওঠে বিস্তৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দুবলার চরে প্রায় ৫ হাজার ১০০ টন শুঁটকি উৎপাদিত হয়েছিল। এ খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় ছিল প্রায় ৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। এই পরিসংখ্যান চরটির অর্থনৈতিক গুরুত্বের পাশাপাশি শুঁটকি উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকার বিষয়টিও তুলে ধরে।
তবে এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সুন্দরবনের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে পরিচালিত হয়। তাই মাছ আহরণ, অস্থায়ী বসতি স্থাপন ও উৎপাদন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে বন বিভাগের অনুমতি, লাইসেন্স এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল রাখার পাশাপাশি বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করাই এখানে বড় চ্যালেঞ্জ।
শুঁটকি উৎপাদনের মৌসুমে আলোরকোল, মেহেরআলীর খাল ও নারিকেলবাড়িয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অস্থায়ী বসতি গড়ে ওঠে। মাসের পর মাস এসব এলাকায় অবস্থান করলেও জেলে ও শ্রমিকদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ জ্বালানি এবং জরুরি যোগাযোগের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে অনেক ক্ষেত্রে জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে জ্বালানি ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি শব্দদূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনার সময় ভোগান্তি বাড়ে।
জেলেদের অভিযোগ, বছরের উল্লেখযোগ্য সময় চরটিতে অবস্থান করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অবদান রাখলেও তাঁদের জন্য জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। টেলিটক ছাড়া অন্য মোবাইল নেটওয়ার্কের সীমিত প্রাপ্যতার অভিযোগও রয়েছে। যোগাযোগব্যবস্থার এই সীমাবদ্ধতা ঝড়, দুর্ঘটনা কিংবা অসুস্থতার মতো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তবে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রে আইনগত ও পরিবেশগত বিধিনিষেধ রয়েছে। এ কারণে বন সংরক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিরাপদ পানির মৌসুমি ব্যবস্থা, বর্জ্য সংগ্রহ, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জরুরি যোগাযোগের জন্য পরিবেশবান্ধব সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
দুবলার চরে শুঁটকি উৎপাদন থেকে রাজস্ব আদায়ের পাশাপাশি জেলে ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের ব্যবস্থা রয়েছে, কোথায় ঘাটতি আছে এবং তা পূরণে কী পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে—সেসব বিষয়ে হালনাগাদ তথ্য ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।
বন বিভাগের অনুমতি ও লাইসেন্সের আওতায় উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালিত হলেও শুধু রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ দিয়ে ব্যবস্থাপনার সাফল্য বিচার করা যায় না। উৎপাদনকেন্দ্রের বর্জ্য কোথায় ফেলা হচ্ছে, মাছ শুকানোর কাজে কী ধরনের জ্বালানি ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অস্থায়ী বসতিতে স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ কতটা বজায় থাকছে—এসব বিষয়েও নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
শুঁটকি উৎপাদনের বর্জ্য, প্লাস্টিক, জ্বালানি ব্যবহারের অবশিষ্টাংশ এবং অপরিকল্পিত জনবসতি আশপাশের পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রে এসব ঝুঁকি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বিশেষ করে বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ রক্ষায় কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ।
দুবলার চরের অন্যতম আকর্ষণ ঐতিহ্যবাহী রাসমেলা ও পুণ্যস্নান। কার্তিকী পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই উৎসবে প্রতিবছর পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বঙ্গোপসাগরের উপকূল এবং শুঁটকি উৎপাদনের কর্মযজ্ঞও পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পর্যটন কার্যক্রম স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও অবদান রাখতে পারে। নৌযান চলাচল, পরিবহন, খাদ্য সরবরাহ ও অন্যান্য সেবার সঙ্গে যুক্ত মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়তে পারে। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোই একমাত্র লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। পর্যটনের চাপ যেন বন, বন্য প্রাণী ও উপকূলীয় পরিবেশের ক্ষতি না করে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এ জন্য পর্যটকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, নির্দিষ্ট বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থা, পরিবেশবান্ধব নৌযান ও জ্বালানির ব্যবহার এবং বন বিভাগের তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রাসমেলা ও পুণ্যস্নানের সময় নিরাপত্তা, জরুরি চিকিৎসা এবং যোগাযোগের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা থাকা দরকার।
দুবলার চরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব ও পরিবেশগত সংবেদনশীলতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। বন বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, মৎস্য অধিদপ্তর, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট জেলে ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ক্ষেত্রে স্থায়ী অগ্রগতি অর্জন কঠিন।
প্রথমত, জেলে ও শ্রমিকদের জন্য পরিবেশবান্ধব উপায়ে নিরাপদ পানীয় জল, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, শুঁটকি উৎপাদনের বর্জ্য সংগ্রহ ও অপসারণের কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, উৎপাদনকেন্দ্র ও পর্যটন এলাকায় নিয়মিত পরিবেশগত তদারকি এবং বিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আয়, উৎপাদনের পরিমাণ ও পরিবেশগত প্রভাবসংক্রান্ত তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা হলে ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়বে।
দুবলার চর শুধু শুঁটকি উৎপাদনের কেন্দ্র নয়; এটি হাজারো মানুষের জীবিকার উৎস এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এই জনপদের উন্নয়নকে কেবল রাজস্বের হিসাব দিয়ে বিচার করা যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে মানুষের মৌলিক চাহিদা, নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে দুবলার চরের সম্ভাবনাকে টেকসই সম্পদে রূপ দেওয়া সম্ভব হবে।
এই বাংলা/এমএস