দেশের বেসরকারি খাতের শিল্পোদ্যোক্তাদের জন্য বিদেশি ঋণ ব্যবহারের প্রক্রিয়া আরও সহজ ও গতিশীল করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে অনুমোদিত মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণের অর্থ সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় সংরক্ষণ ও লেনদেন করতে পারবেন সংশ্লিষ্ট শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তারা। এ লক্ষ্যে অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকগুলোতে যোগ্য ঋণগ্রহীতাদের নামে বৈদেশিক মুদ্রা বা ফরেন কারেন্সি (এফসি) হিসাব খোলার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (৭ অক্টোবর, ২০২৬) বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ-২ (ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট-২ বা এফইপিডি-২) এ সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ সার্কুলার জারি করে দেশের সব অনুমোদিত ডিলার ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে। ‘এফইপিডি-২ সার্কুলার নং-০৬’ শীর্ষক এ নির্দেশনায় বিদেশি ঋণের তহবিল ব্যবস্থাপনা, অর্থ ছাড়, ব্যবহার এবং পরিশোধের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান স্পষ্ট করা হয়েছে।
নীতিমালার প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য
সার্কুলারে জানানো হয়, গত ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে জারি করা এফইপিডি-১ সার্কুলার নং-৩২-এর পার্ট-সি-এর অনুচ্ছেদ ২৮ অনুযায়ী উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে বেসরকারি খাতের শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি ঋণ গ্রহণের সুযোগ পেয়ে আসছে। তবে অনুমোদিত বিদেশি ঋণের অর্থ ব্যবহারে আন্তর্জাতিক লেনদেন ও সীমানা পেরিয়ে অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও সুশৃঙ্খল করতে এ নতুন সুবিধা যুক্ত করা হলো। এর ফলে উদ্যোক্তারা সরাসরি বিদেশি মুদ্রায় ঋণ গ্রহণ করে তা নিজেদের এফসি হিসাবে জমা রাখতে পারবেন।
যথাযথ অনুমোদন নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা
সার্কুলারের নির্দেশনা অনুযায়ী, এ ধরনের এফসি হিসাব খোলার আগে এডি ব্যাংকগুলোকে ঋণগ্রহীতার প্রয়োজনীয় অনুমোদনের প্রমাণাদি যাচাই ও সংরক্ষণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ইনভেস্ট বাংলাদেশ অথরিটির (আইবিএ) ‘স্ক্রুটিনি কমিটি অন ফরেন লোন/সাপ্লায়ার্স ক্রেডিট’-এর অনুমোদনের সত্যায়িত কপি ব্যাংকে জমা রাখা বাধ্যতামূলক। এ ছাড়া যেসব ক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদনের জন্য সরাসরি বাংলাদেশ ব্যাংক কিংবা সরকারের ‘স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোন’ (এসসিএনসিএল)-এর সম্পৃক্ততা রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র ও অনুমোদনের মূল বা সত্যায়িত কপি যাচাই করেই কেবল ব্যাংকগুলোকে হিসাব খোলার অনুমতি দিতে হবে।
অর্থ ব্যবহারের অনুমোদিত খাত ও শর্তাবলি
এফসি হিসাবে থাকা বিদেশি ঋণ কোন কোন খাতে কীভাবে ব্যয় করা যাবে, তা সার্কুলারে নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। প্রধান নির্দেশনাগুলো হলো:
১. আমদানি মূল্য পরিশোধ: দেশে প্রচলিত কার্যকর ‘আমদানি নীতি আদেশ’ (ইমপোর্ট পলিসি অর্ডার) এবং বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইনাবলি পুরোপুরি মেনে এই হিসাবের অর্থ দিয়ে আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে। মূলধনি যন্ত্রপাতি বা প্রকল্পের কাঁচামাল আমদানির দায় সরাসরি এ হিসাব থেকে ডলারে পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
২. প্রকল্পের সেবা মূল্য পরিশোধ: যে সুনির্দিষ্ট কাজের বা প্রকল্পের জন্য বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে, সেই প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় বৈধ সেবামূল্য (সার্ভিস পেমেন্ট) এ হিসাব থেকে পরিশোধ করা যাবে। তবে এ ধরনের সেবা পরিশোধের ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে যথাযথ যাচাই-বাছাই (ডিউ ডিলিজেন্স) করতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যমান আইন অনুযায়ী উৎসে কর (ট্যাক্স) ও ভ্যাট কর্তন করে সরকারি কোষাগারে জমা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ব্যাংককে দেওয়া হয়েছে।
৩. স্থানীয় ক্রয়ের জন্য টাকায় রূপান্তর: প্রকল্পের স্থানীয় কেনাকাটা বা দেশীয় ব্যয়ের ক্ষেত্রে ঋণ অনুমোদনের শর্ত সাপেক্ষে এফসি হিসাবের বৈদেশিক মুদ্রা টাকায় রূপান্তর (এনক্যাশমেন্ট) করা যাবে।
৪. সুদ বা মুনাফা প্রাপ্তির সুযোগ: এফসি হিসাবে রক্ষিত অর্থের ওপর গ্রাহক চাইলে সুদ বা মুনাফাও পেতে পারেন। সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকার ও গ্রাহকের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নীতিমালার আওতায় এ ধরনের এফসি হিসাবের স্থিতির ওপর সুদ বা মুনাফা প্রযোজ্য হবে।
ত্রৈমাসিক তদারকি ও ‘ফরম এলইউ’ দাখিল
বিদেশি ঋণের কোনো অপব্যবহার যেন না হয়, সেজন্য কঠোর তদারকি কাঠামো তৈরি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নির্দেশনা অনুযায়ী, ঋণের অর্থ উত্তোলন ও ব্যয়ের প্রতিটি ধাপ নির্ধারিত ‘ফরম এলইউ’ (Form LU)-তে ব্যাংকগুলোকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ ইনভেস্টমেন্ট ডিপার্টমেন্টে (এফইআইডি) নিয়মিত প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
প্রতিটি ত্রৈমাসিক প্রান্তিক—অর্থাৎ ডিসেম্বর, মার্চ, জুন এবং সেপ্টেম্বর শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই ব্যবহার বিবরণী পাঠানো বাধ্যতামূলক। এই ফরমে ঋণের মোট ড্র-ডাউন, এফসি হিসাবে জমার তারিখ, বৈদেশিক মুদ্রায় পরিশোধের পরিমাণ, টাকায় রূপান্তরের অঙ্ক, অর্থ গ্রহণকারীর নাম-ঠিকানা এবং ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বিশদভাবে উল্লেখ করে ঋণগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যাংক উভয়কেই যৌথভাবে স্বাক্ষর করতে হবে।
হিসাব পরিচালনা ও কিস্তি পরিশোধের সময়সীমা
ঋণের পুরো অর্থ ছাড় ও প্রকল্প অনুযায়ী যথাযথ ব্যবহার সম্পন্ন হওয়ার পরপরই সংশ্লিষ্ট এফসি হিসাবটি বন্ধ করে দিতে হবে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংককে তা লিখিতভাবে অবহিত করতে হবে।
তবে এতে একটি বড় ব্যতিক্রম ও সুবিধা রাখা হয়েছে: যদি ঋণচুক্তিতে বিদেশি ঋণ পরিশোধের উদ্দেশ্যে তহবিল সংরক্ষণের কোনো শর্ত থাকে, তবে ঋণের চূড়ান্ত মেয়াদ পর্যন্ত এফসি হিসাবটি বহাল রাখা যাবে।
কিস্তি পরিশোধের সুবিধার্থে এই হিসাবে আমদানি দায় মেটানোর পর অবশিষ্ট নিট রপ্তানি আয় এবং বৈধ স্থানীয় উৎস থেকে টাকায় কেনা বৈদেশিক মুদ্রা জমা রাখা যাবে। তবে তহবিলে অতিরিক্ত ডলার অলস ফেলে রাখা যাবে না; সার্কুলার অনুসারে, ঋণ পরিশোধের জন্য রক্ষিত ব্যালান্স কোনো অবস্থাতেই পরবর্তী সর্বোচ্চ তিনটি কিস্তি পরিশোধের প্রয়োজনীয় পরিমাণের বেশি হতে পারবে না।
ব্যবসা ও শিল্পে প্রভাব
অবিলম্বে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের উৎপাদনশীল ও শিল্প খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময়জনিত ঝুঁকি (এক্সচেঞ্জ রেট রিস্ক) ও লেনদেন ব্যয় অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। এর আগে অনুমোদিত বিদেশি ঋণের অর্থ সরাসরি ডলারে সংরক্ষণ করতে না পারায় অনেক ক্ষেত্রে মুদ্রা রূপান্তরের সময় উদ্যোক্তাদের বাড়তি খরচ বহন করতে হতো। নতুন এ নির্দেশনার ফলে বড় প্রকল্পের আমদানি ও সেবামূল্য পরিশোধের প্রক্রিয়া দ্রুততর হবে, যা দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাস্তবায়নকে আরও গতিশীল করবে।
এই বাংলা/এমএস