দেবী দুর্গাকে অন্নপূর্ণা রূপে তুলে ধরে ক্ষুধামুক্ত পৃথিবী ও খাদ্যনিরাপত্তার মানবিক বার্তা দিয়েছে চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর বীণাপাণি পূজামণ্ডপ। মণ্ডপের ব্যতিক্রমী ভাবনা, নান্দনিক সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জা দেখে প্রশংসা করেছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বোয়ালখালীর বিভিন্ন পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে বীণাপাণি পূজামণ্ডপের আয়োজন ঘুরে দেখেন জেলা প্রশাসক। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম। পরিদর্শনকালে তাঁরা পূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কেও খোঁজ নেন।
বীণাপাণি পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গাকে এবার অন্নপূর্ণা রূপে সাজানো হয়েছে। আয়োজকদের ভাষ্য, এই উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে এমন একটি পৃথিবীর প্রত্যাশা তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে কোনো মানুষ বা পরিবারকে খাদ্যের অভাবে থাকতে হবে না।
মণ্ডপের সৃজনশীল আয়োজনের প্রশংসা করে জেলা প্রশাসক বলেন, অনেক মন্দির ও পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করলেও এখানকার ভাবনা তাঁর কাছে আধুনিক ও ব্যতিক্রমী মনে হয়েছে। এ আয়োজনের মধ্য দিয়ে সৃজনশীলতার অসাধারণ প্রকাশ ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পূজামণ্ডপের সভাপতি প্রবীর চৌধুরী জানান, হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাসে অন্নপূর্ণা অন্ন ও প্রাচুর্যের দেবী। দুর্গাকে এই রূপে উপস্থাপনের মাধ্যমে শক্তির পাশাপাশি মানুষের জীবনরক্ষা, মমতা ও কল্যাণের বিষয়টিও তুলে ধরতে চেয়েছেন তাঁরা। তাঁদের প্রত্যাশা, পৃথিবীর প্রতিটি ঘরে খাবার থাকবে এবং কেউ ক্ষুধার্ত থাকবে না।
মণ্ডপে দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্যের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখার পরামর্শ দেন জেলা প্রশাসক। আয়োজকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৫০০ মানুষ মণ্ডপটি দেখতে আসেন। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে পর্যাপ্ত শীতলীকরণব্যবস্থা রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সুন্দর আয়োজনের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করাও জরুরি।
এর আগে জেলা প্রশাসক বোয়ালখালীর প্রায় ২৫০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত মেধসমুনি আশ্রম পরিদর্শন করেন। সেখানে পূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।
চট্টগ্রামে নতুন প্রায় ৪০০ পূজামণ্ডপ
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানান, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এবারই প্রথম শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ উৎসবকে কেন্দ্র করে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে।
তিনি বলেন, এবার দুর্গাপূজায় সরকারি সহায়তার পরিমাণ ও আওতা বাড়ানো হয়েছে। সারা দেশে গতবারের তুলনায় প্রায় ১ হাজার ৫০০টি সর্বজনীন পূজামণ্ডপ বেড়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম জেলাতেই নতুন পূজামণ্ডপের সংখ্যা প্রায় ৪০০টি।
জেলার বিভিন্ন মণ্ডপে প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি আছে কি না, তা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নিরাপত্তায় থাকবেন ১৭ হাজারের বেশি সদস্য
চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম জানান, শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) থেকে জেলার সব পূজামণ্ডপে নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর হবে। এ জন্য ১২ হাজার আনসার সদস্য এবং পাঁচ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
নিরাপত্তার অংশ হিসেবে পুলিশের ভ্রাম্যমাণ টহল, সাদাপোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং মণ্ডপের প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদার করা হবে। পুলিশ সুপার বলেন, সব মিলিয়ে পূজামণ্ডপগুলোকে নিরাপত্তার আওতায় আনা হবে।
তিনি আরও জানান, পূজাকে ঘিরে গুজব, ভুয়া সংবাদ, অপপ্রচার ও সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে পুলিশ সতর্ক রয়েছে। নিরাপত্তা নিয়ে পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতাদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবকদের সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন এবং প্রতিমা বিসর্জনের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রতিমা বিসর্জন সূর্যাস্তের আগেই সম্পন্ন করার জন্য আয়োজকদের অনুরোধ জানানো হয়েছে। প্রশাসন, পুলিশ ও পূজা উদ্যাপন পরিষদের সমন্বিত উদ্যোগে উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হবে বলে আশা প্রকাশ করেন পুলিশ সুপার।
২০ অক্টোবর চট্টগ্রামে আসছেন প্রধানমন্ত্রী
জেলা প্রশাসক জানান, আগামী ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী চট্টগ্রাম সফর করবেন। এ সময় নগরের জেমসন হলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দুর্গোৎসবের আয়োজনে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রীর সফরসূচি পাওয়ার কথা জানান তিনি।
পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী দুর্গাপূজার প্রস্তুতি ও নিরাপত্তার বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন। উৎসব নির্বিঘ্ন করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্কতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এবারের দুর্গোৎসব সবার সহযোগিতায় নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হবে বলে আশা প্রকাশ করেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার।
এই বাংলা/এমএস