কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় প্রায় ছয় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ কেন্দ্র চার বছরেও চালু হয়নি। দীর্ঘদিন তালাবদ্ধ পড়ে থাকায় কেন্দ্রটিতে স্থাপন করা মূল্যবান আধুনিক যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এতে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাত করে কৃষকদের আয় বাড়ানোর উদ্যোগও মুখ থুবড়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম ও জামালপুর জেলার প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য হ্রাসকরণ প্রকল্পের আওতায় পল্লী উন্নয়ন একাডেমি (আরডিএ), বগুড়া কুড়িগ্রাম ও জামালপুর জেলার আটটি উপজেলায় কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ছিল ২০১৮ সালের ১ জুলাই থেকে ২০২২ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত।
প্রকল্পের আওতায় কুড়িগ্রামের রাজারহাট, নাগেশ্বরী, উলিপুর ও চিলমারী এবং জামালপুরের চার উপজেলায় এসব কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ছয় কোটি টাকা।
আরডিএর তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রগুলোতে চাল, আটা, মসলা ও অন্যান্য কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতের পাশাপাশি দুধ, মাছ ও মাংস সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথা ছিল। রাজারহাটের কেন্দ্রটিতে ধান, গম ও সরিষা ভাঙানো, মসলা, চিপস ও বেকারি পণ্য প্রক্রিয়াজাতের সুবিধা রয়েছে। পাশাপাশি দুধ, মাছ ও মাংস সংরক্ষণের জন্য কোল্ড চেম্বারসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে কেন্দ্রটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। পরে প্রয়োজনীয় মেশিনপত্র স্থাপন করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কেন্দ্রটি হস্তান্তর করে। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হয়নি।
কর্তৃপক্ষের দাবি, জনবল সংকট ও পরিচালনা-সংক্রান্ত নীতিমালার জটিলতার কারণে কেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব হয়নি। আগের নীতিমালা অনুযায়ী আরডিএর নিজস্ব জনবল দিয়ে কেন্দ্র পরিচালনার কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় কার্যক্রম শুরু করা যায়নি।
বর্তমানে নীতিমালা পরিবর্তন করে সমবায়ভিত্তিক সমিতি, এনজিও অথবা আগ্রহী উদ্যোক্তার কাছে টেন্ডারের মাধ্যমে তিন বছর মেয়াদে কেন্দ্রটি লিজ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে সেই প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে এবং কবে কেন্দ্রটির কার্যক্রম শুরু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা জানাতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
সরেজমিনে দেখা যায়, কেন্দ্রটির প্রধান ফটক তালাবদ্ধ। ভেতরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের আধুনিক মেশিনপত্র। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কেন্দ্রটিতে পাহারাদার থাকার কথা থাকলেও সরেজমিনে কাউকে পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, কৃষকদের সুবিধার কথা বলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করা হলেও তা কাজে না লাগায় প্রকল্পের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে।
রাজারহাট উপজেলার চাকিরপশার ইউনিয়নের কৃষক মো. আবেদ আলী বলেন, “কৃষকরা অনেক কষ্ট করে ধান, গম, সরিষাসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেন। বাজারে দাম কম থাকলে অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে ফসল বিক্রি করতে হয়। কেন্দ্রটি চালু হলে ফসল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাত করে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। ছয় কোটি টাকা খরচ করে কেন্দ্র বানিয়ে যদি তালাবদ্ধই রাখা হয়, তাহলে কৃষকদের কী লাভ?”
উমর মজিদ ইউনিয়নের কৃষক মো. সালাম মিয়া বলেন, “কৃষকদের সুবিধার জন্য এত বড় একটি কেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। অথচ বছরের পর বছর ধরে এটি বন্ধ। ভেতরে দামি মেশিনপত্র পড়ে আছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে এসব মেশিন নষ্ট হবে। দ্রুত এটি চালু করে কৃষকদের কাজে লাগানো দরকার।”
এ বিষয়ে রাজারহাট উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা এস এম শওকত আলম বলেন, “প্রকল্পটি আমাদের মন্ত্রণালয়ের হলেও প্রকল্পটি সম্পর্কে আমি কিছু জানি না। এটির ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়ে দেখব।”
রংপুর পল্লী উন্নয়ন একাডেমির পরিচালক মো. জাহেদুল হক চৌধুরী বলেন, “আগের নীতিমালা অনুযায়ী কেন্দ্রগুলো নিজস্ব জনবল দিয়ে পরিচালনার কথা ছিল। কিন্তু জনবল সংকটের কারণে সেগুলো চালু করা যাচ্ছে না। তাই নীতিমালা পরিবর্তন করে টেন্ডারের মাধ্যমে কেন্দ্রগুলো লিজ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।” তবে কবে নাগাদ কেন্দ্রটি চালু হবে, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট করে কিছু বলতে পারেননি।
রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা কেন্দ্র পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোছা. তানজিলা তাসনিম বলেন, “বিষয়টি সম্পর্কে আমার কিছু জানা নেই। আমি দেখব এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেব।”
এই বাংলা/এমএস