মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হন্যে হয়ে ঘুরেও মিলছে না সার, ঘাটতি মানতে নারাজ কৃষি বিভাগ

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সারের সংকট কাটছে না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। আমন ও সবজি চাষের পাশাপাশি রবি মৌসুমের আগাম সবজি চাষে সারের চাহিদা থাকলেও চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম এবং বিতরণে বৈষম্য হচ্ছে বলে তাদের অভিযোগ। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় সারের ঘাটতি নেই; বরং কৃষকদের অতিরিক্ত সার ব্যবহারের প্রবণতা রয়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, সার বিক্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়ানো হলেও চাহিদা অনুযায়ী সার মিলছে না। কেউ একাই কয়েক বস্তা সার পাচ্ছেন, আবার কয়েকজন কৃষক মিলে একটি বস্তা সার পাচ্ছেন। ফলে সার না পেয়ে অনেক কৃষককে একাধিকবার বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছর জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে কুড়িগ্রামে সারের বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ইউরিয়া বরাদ্দ ৫৫০ টন কমেছে। অন্যদিকে ডিএপির বরাদ্দ বেড়েছে ৬৬৫ টন।

বিতরণে বৈষম্যের অভিযোগ

বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ ভরতেরছড়া গ্রামের কৃষক মো. আবু বক্কর বলেন, ‘সারের জন্য ঘুরতে ঘুরতে জান শ্যাষ। বারে বারে একে লোক সার পায়। আমরা ঘুইরাও পাই না। নিয়ম করি দেইক, তাইলে সবাই পায়। সার দেয় মুখ দেইখা।’

গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীর মোড়ের নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেউ একাই এক বস্তা সার নিয়ে যাচ্ছেন, আবার কয়েকজন মিলে একটি বস্তা নিচ্ছেন। সেখানে সার না পেয়ে বহু কৃষককে ফিরে যেতে দেখা যায়।

কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার বা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পরিচিতরা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। তবে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের প্রতিনিধিরা এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

ওই বিক্রয়কেন্দ্রের সার বিক্রেতা মো. মতিয়ার রহমান বলেন, ‘সার পাইছি ৪০ বস্তা—৩০ বস্তা ডিএপি ও ১০ বস্তা টিএসপি। তিনশোর বেশি কৃষক। দুই-তিনজন মিলে একটা করে বস্তা নিছে। তাও কুলান যায় না। ইউরিয়া এক বস্তাও পাই নাই। এই ওয়ার্ডে আরও অন্তত দেড়শো বস্তা সার দরকার।’

বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের ক্যাম্প মোড়ে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলার মেসার্স জনার্দ্দন চন্দ্র সাহার প্রতিনিধি মো. আবুল হাসেম বলেন, ‘এই ইউনিয়নে যে পরিমাণ সার লাগে, সে সার পাচ্ছি না।’

আগাম সবজি চাষেও সংকট

ভূরুঙ্গামারীর দুধকুমার নদের গুনাইয়েরকুটি চরে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষকেরা আগাম বেগুন চাষ শুরু করেছেন। কৃষকেরা জানান, এ সময়ে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের প্রয়োজন হলেও চাহিদা অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না।

গুনাইয়েরকুটি গ্রামের কৃষক মো. মোজাম্মেল হক বলেন, ডিলার পয়েন্টে সবাইকে ১০ কেজি করে সার দেওয়ার কথা বলা হলেও কেউ কেউ স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে কয়েক বস্তা করে সার পাচ্ছেন বলে তিনি অভিযোগ করেন। সাধারণ কৃষকেরা চার-পাঁচবার ঘুরেও সার পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেন তিনি।

অনুমোদিত হারের তুলনায় বরাদ্দ কতটা?

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে আমন, ২ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সবজি এবং ৩৪৫ হেক্টর জমিতে আগাম বেগুন চাষ হয়েছে। এ ছাড়া ফুলকপি ও বাঁধাকপি মিলিয়ে প্রায় ২০০ হেক্টর জমিতে আবাদ রয়েছে।

শুধু ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় রোপা আমন হয়েছে ১৬ হাজার ৯০০ হেক্টর, সবজি ৪৪০ হেক্টর এবং আগাম বেগুন ২৭৩ হেক্টর জমিতে। উপজেলায় আগাম বেগুন চাষের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে ৬৯০ হেক্টর।

কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, প্রতি হেক্টর রোপা আমনে ইউরিয়া প্রয়োগের অনুমোদিত মাত্রা ১৯৫ কেজি। বেগুনে ২৬০ কেজি, ফুলকপিতে ২৬০ কেজি এবং বাঁধাকপিতে ৩৯০ কেজি ইউরিয়া প্রয়োগের পরামর্শ রয়েছে।

এই হিসাবে জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর আমন জমিতে ইউরিয়া প্রয়োজন প্রায় ২৩ হাজার ৬২৯ টন। ৩৪৫ হেক্টর বেগুনে প্রয়োজন প্রায় ৯০ টন। আর প্রায় ২০০ হেক্টর কপি চাষে প্রয়োজন আরও প্রায় ৬৫ টন। অর্থাৎ এসব ফসলের জন্য ইউরিয়ার প্রয়োজন প্রায় ২৩ হাজার ৭৮৪ টন।

অন্যদিকে জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাসে কুড়িগ্রাম জেলায় ইউরিয়া বরাদ্দ হয়েছে ১২ হাজার ৪৮৩ টন। এর মধ্যে ভূরুঙ্গামারীর জন্য বরাদ্দ ১ হাজার ৪০৩ টন।

এ ছাড়া কৃষি বিভাগের উল্লেখিত প্রয়োগমাত্রা অনুযায়ী জেলায় টিএসপির প্রয়োজন প্রায় ৬ হাজার ১৬৪ টন। আমন চাষে ডিএপির প্রয়োজন প্রায় ১০ হাজার ৯০৫ টন। তবে গত তিন মাসে জেলায় টিএসপি বরাদ্দ হয়েছে ২ হাজার ১০৪ টন এবং ডিএপি ৫ হাজার ৬৭ টন।

তবে এসব হিসাবের সঙ্গে বাস্তবে সারের প্রয়োজন ও বরাদ্দের তুলনা করতে ফসলের পর্যায়, মাটির উর্বরতা, আগের মৌসুমের অবশিষ্ট পুষ্টি এবং ডিএপি-টিএসপির বিকল্প ব্যবহারের বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া হয় বলে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে।

ঘাটতি মানতে নারাজ কৃষি বিভাগ

কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বোরো মৌসুমে কৃষকেরা অনুমোদিত মাত্রায় যে নন-ইউরিয়া সার ব্যবহার করেন, তার একটি অংশ মাটিতে থেকে যায়। এ কারণে আমন মৌসুমে নন-ইউরিয়া সারের প্রয়োজন তুলনামূলক কম হয়।

তিনি বলেন, একই জমিতে ডিএপি ব্যবহার করলে আলাদাভাবে টিএসপি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। এ ছাড়া আমন মৌসুমে নিয়মিত বৃষ্টিপাত ও জমির উর্বরতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে ইউরিয়ার প্রয়োজনও কমে যায়।

বরাদ্দ ঘাটতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এটা ঘাটতি নয়। এভাবেই বরাদ্দ ও ব্যবহার হয়ে আসছে। আমন মৌসুমে অনেক জমি উর্বর থাকে। এই সময় নিয়মিত বৃষ্টি হয়। সে কারণে অনেক জমিতে ইউরিয়া ব্যবহারের প্রয়োজন কম পড়ে। বরং তখন বেশি সার দিলে ফসল নুয়ে পড়তে পারে।’

ভূরুঙ্গামারীতে নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ইউরিয়া ও ডিএপি চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

এদিকে কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে বিতরণব্যবস্থা, ডিলারদের বরাদ্দ ও বিক্রির হিসাব এবং কৃষকদের প্রকৃত চাহিদা যাচাই করা হলে সারের সংকট ও বরাদ্দের পার্থক্যের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর