বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৫:০১ অপরাহ্ন

কোটি টাকার সড়কে জলাবদ্ধতা, নিম্নমানের কাজের অভিযোগ: বিল নিয়ে ঠিকাদার-পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার দ্বন্দ্ব

নগরকান্দা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬

ফরিদপুরের নগরকান্দায় প্রায় কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি সড়ক নিয়ে নিম্নমানের কাজ ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কয়েক বছর না যেতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাথর উঠে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টিতেই কোথাও কোথাও পানি জমে যাওয়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও পথচারীরা।

এদিকে সড়ক নির্মাণের বকেয়া বিল ছাড়ানোকে কেন্দ্র করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ও পৌর নির্বাহী কর্মকর্তার মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, বকেয়া বিল ছাড়ানোর জন্য পৌরসভার সচিব তাঁর কাছ থেকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছেন এবং আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করছেন। এ টাকা ফেরত চাইলে তাঁকে মারধর করে হাত ভেঙে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন তিনি।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ঠিকাদার যথাসময়ে কাজ বুঝিয়ে দিতে পারেননি এবং কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, অফিসে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে ঠিকাদার নিজেই চেয়ার থেকে পড়ে আহত হন।

জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৭ অক্টোবর সড়কটির নির্মাণকাজের টেন্ডার হয়। কাজটি হোসেন এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেলেও পরবর্তীতে সৈয়দ জাহানারা এন্টারপ্রাইজ নামে একটি প্রতিষ্ঠান কাজটি সম্পন্ন করে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী হাসিবুল হাসান আবদুল্লাহ।

২০২১-২২ অর্থবছরের আইইউআইডিপি প্রকল্পের আওতায় সড়কটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। চুক্তিমূল্য ছিল ৯৮ লাখ ২৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে আরসিসি সড়কের দৈর্ঘ্য ৭৪৮ মিটার। সংশ্লিষ্ট কাজের বিপরীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩২ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে বলে জানা গেছে।

চুক্তি অনুযায়ী কাজ শুরুর পর ছয় মাসের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, ২০২৫ সালে কাজটি পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ যথাযথভাবে বুঝিয়ে দেয়নি।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী হাসিবুল হাসান আবদুল্লাহ বলেন, ‘আমি রাস্তার কাজ শেষ করে তাদের বুঝিয়ে দিয়েছি। বাকি বিলের জন্য সচিবের কাছে যাই। কাজের বিল ছাড়াতে সচিব আমার কাছ থেকে আগে পাঁচ লাখ টাকা নিয়েছেন। এখন আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করছেন। আগের টাকা ফেরত চাইলে আমাকে মারধর করে আমার হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’

অভিযোগের বিষয়ে নগরকান্দা পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যথাসময়ে রাস্তার কাজ বুঝিয়ে দিতে পারেনি। রাস্তার কাজে অনিয়ম থাকায় ৩২ লাখ টাকার বিল এখনো দেওয়া হয়নি। ১২ আগস্ট দুপুরে বিল ছাড়াতে ঠিকাদার আমার অফিসে আসেন এবং আমাকে গালমন্দ করেন। একপর্যায়ে তিনি নিজেই চেয়ার থেকে পড়ে গিয়ে আহত হন।’

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজওয়ানা আফরিন বলেন, ‘রাস্তার কাজে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম থাকায় বিলের ৩০ লাখ টাকা দেওয়া হয়নি। বাকি টাকা নিতে ঠিকাদার হাসিবুল হাসান আবদুল্লাহ পৌরসভায় গেলে পৌর নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে তাঁর বাকবিতণ্ডা হয়। এ সময় তিনি নিজেই পড়ে গিয়ে আহত হয়েছেন বলে শুনেছি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণের পর থেকেই সড়কটির মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সড়ক নির্মাণে নিম্নমানের ও ব্যবহৃত পাথর ব্যবহার এবং পাথরের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সিমেন্ট ব্যবহার না করার অভিযোগও করেছেন তারা। বৃষ্টির পানি জমে সড়কের বিভিন্ন অংশের পাথর উঠে গিয়ে বর্তমানে তা খানাখন্দে পরিণত হয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, সড়কটির বিভিন্ন অংশে প্রায় সারা বছরই পানি জমে থাকে। ফলে অনেক সময় মূল সড়ক ব্যবহার করতে না পেরে পথচারীদের ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা দিয়ে চলাচল করতে হয়। এতে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, অফিসগামী মানুষ ও হাট-বাজারে আসা সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সড়কটি সংস্কার করে চলাচলের উপযোগী করার পাশাপাশি নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তদন্তে অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর