শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ০২:৪২ পূর্বাহ্ন

কুড়িগ্রামে ডিবি-পুলিশ পরিচয়ে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের সঙ্গে প্রতারণা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

‘আপনার সন্তান মাদকসহ পুলিশের হাতে আটক’—ফোনের অপর প্রান্ত থেকে এমন কথা শুনেই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন অভিভাবকেরা। এরপর নিজেকে পুলিশ বা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে মামলা, জেল ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে কখনো ওয়্যারলেস ও গাড়ির সাইরেনের শব্দ, আবার কখনো সন্তানের কান্নার মতো আওয়াজ শোনানো হচ্ছে। একপর্যায়ে বিকাশ বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দ্রুত টাকা পাঠানোর চাপ দেওয়া হচ্ছে।

কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলায় এমন কৌশলে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের টার্গেট করে প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একই ধরনের একাধিক ঘটনায় অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, চিলমারী সদরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক ও বিত্তশালী ব্যক্তিদের বেছে বেছে ফোন করছে চক্রটি।

গত ১৩ আগস্ট চিলমারী সদরের একটি প্রতিষ্ঠানের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানভীর আহমেদ তামিমের বাবা ও সাবেক ইউপি সদস্য এমদাদুল হকের কাছে ফোন আসে। ফোনে জানানো হয়, তাঁর ছেলেকে ইয়াবাসহ আটক করা হয়েছে। এরপর সন্তানের কান্নার মতো আওয়াজ শোনানো হলে তিনি আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

মামলা থেকে ছেলেকে বাঁচাতে দ্রুত ৩০ হাজার টাকা বিকাশে পাঠাতে বলা হয়। তবে বড় মেয়ের সন্দেহ হওয়ায় তিনি টাকা পাঠাননি। পরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে ছেলেকে নিরাপদ অবস্থায় দেখতে পান তিনি।

এমদাদুল হক অভিযোগ করেন, ঘটনার পর থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গেলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।

এর আগে গত ২৯ জুন রমনা মডেল ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোলাম আশেক আকাকেও একই কায়দায় ফোন করা হয়। কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে পড়ুয়া তাঁর ছেলে গোলাম মোহাম্মদ ইসফাতুজ্জামান মাদকসহ আটক হয়েছেন বলে ভয়ভীতি দেখানো হয়। বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরিতে ফোনে সন্তানের কান্নার শব্দও শোনানো হয়। পরে ছেলেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার কথা বলে দুই দফায় ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। পরে ছেলে নিরাপদে আছেন জানতে পেরে প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন তিনি এবং চিলমারী থানায় অভিযোগ করেন।

এ ছাড়া গত ১৬ আগস্ট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. মাসুদুর রহমান মাসুদ, মো. মোজাফ্ফর রহমান, মোছা. নাছরিন বেগম, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. আয়নাল হক, মো. আব্দুল গাফ্ফার, মো. আব্দুর রহিম, মোছা. নাছিমা খাতুন, মো. সোহেল রানা, মো. মিজানুর রহমান মিজান ও ব্যবসায়ী মো. সোহেল মিয়াসহ আরও কয়েকজনকে টার্গেট করে ভয়ভীতি দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

চেয়ারম্যান গোলাম আশেক আকা বলেন, ‘প্রতারকরা ফোন করে আমার সন্তানকে মাদকসহ আটকের কথা জানিয়ে টাকা দাবি করে। কথাবার্তা ও কৌশল এতটাই বিশ্বাসযোগ্য ছিল যে আমিও আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। সন্তানের কান্নার শব্দ শুনে দুই দফায় ৩০ হাজার টাকা পাঠাই। পরে যাচাই করে বুঝতে পারি, আমি প্রতারক চক্রের ফাঁদে পড়ে টাকা খুইয়েছি।’

চিলমারী উপজেলায় এ ধরনের প্রতারণার শিকার হয়ে মোট কতজন অভিভাবক অর্থ খুইয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি চিলমারী থানা। তবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক মাসে উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও বিত্তশালী অভিভাবকদের টার্গেট করে অন্তত অর্ধশত শিক্ষার্থীর অভিভাবককে ফোন করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে চক্রটি।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতারকেরা ফোনে শিক্ষার্থীর নাম, শ্রেণি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তথ্যও জানায়। তবে এসব তথ্য তারা কোথা থেকে সংগ্রহ করছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এদিকে, প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে টাকা দিলেও সামাজিক লজ্জা বা হয়রানির আশঙ্কায় বিষয়টি প্রকাশ করছেন না বলে একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চিলমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নয়ন কুমার বলেন, ‘পুলিশ-ডিবির পরিচয়ে অভিভাবকদের ফোন করে টাকা দাবির বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। প্রতারক চক্রকে শনাক্ত করতে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহযোগিতা নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রতারকদের ব্যবহৃত ফোন নম্বরসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা হচ্ছে।’

সচেতনতার আহ্বান: পুলিশ বা কোনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে ফোন করে সন্তানের আটকের কথা বলে তাৎক্ষণিক টাকা দাবি করা হলে আতঙ্কিত না হয়ে প্রথমে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কোনো অপরিচিত ব্যক্তির দেওয়া নম্বরে টাকা না পাঠিয়ে দ্রুত নিকটস্থ থানায় বিষয়টি জানানো উচিত।

এই সম্পর্কিত আরো খবর