সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:১২ অপরাহ্ন

কুড়িগ্রামের সীমান্তে রাতের আঁধারে ভারতে পাচার হচ্ছে ‘সোনালি আঁশ’ পাট

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
  • প্রকাশকালঃ সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কুড়িগ্রামে রাতের আঁধারে নদীপথে ভারতে পাচার হচ্ছে দেশের অন্যতম অর্থকরী ফসল ‘সোনালি আঁশ’ পাট। দিনের বেলায় স্বাভাবিকভাবে বেচাকেনা চললেও রাত নামলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে পাট পাচারকারী চক্র। ইঞ্জিনচালিত নৌযানে করে পাট সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুড়িগ্রাম জেলার জাহাজের আলগা, সাহেবের আলগা, নারায়ণপুর, পাখিউড়া, শৌলমারী, বেরুবাড়ী, নুনখাওয়া, কাপনা, পদ্মারচর, যাত্রাপুর, কচাকাটা ও মাদারগঞ্জসহ বিভিন্ন চর থেকে দিনের বেলায় কৃষকদের কাছ থেকে পাট সংগ্রহ করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, রাত ২টার পর সক্রিয় হয়ে ওঠে পাচারকারী চক্র। ধরলা, দুধকুমার, ব্রহ্মপুত্র ও নীলকমল নদের চরাঞ্চলে স্তূপ করে রাখা পাট নৌকায় তুলে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ধুবরি জেলার কাটামারি এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

সম্প্রতি মধ্যরাতে কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর নৌঘাট থেকে পাট পরিবহনকারী একটি নৌযানে যান এই প্রতিবেদক। কয়েকজন পাটচাষির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশে তুলনামূলক কম দাম পাওয়ায় তারা প্রায় এক মাস ধরে ভারতের ধুবরির কাটামারি এলাকায় পাট বিক্রি করছেন। তাদের দাবি, প্রতি রাতে বিভিন্ন চর থেকে ১০-১২টি নৌকা পাট সংগ্রহ করে ভোর হওয়ার আগেই সীমান্তের ওপারে চলে যায়। তাদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রতি মাসে জেলার নদীপথ দিয়ে ৩০-৩৫ হাজার মণ পাট ভারতে পাচার হচ্ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, দিনের তুলনায় রাতে নদীপথের চিত্র বদলে যায়। রাত গভীর হলে নদনদীর প্রায় ২০-২৫টি পয়েন্টে নৌযানের চলাচল বেড়ে যায় বলে দাবি তাদের।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে নাগেশ্বরী উপজেলার চর নারায়ণপুরের এক পাটচাষি বলেন, “বাংলাদেশে প্রতি মণ পাটের বর্তমান বাজারমূল্য তিন হাজার ৮০০ থেকে চার হাজার ২০০ টাকা। অন্যদিকে, ভারতে প্রতি মণ পাটের বর্তমান বাজারমূল্য পাঁচ হাজার ৫০০ থেকে ছয় হাজার টাকা। লাভ বেশি, কষ্ট নাই, তাই পাট ভারতে বিক্রি করি।”

রৌমারী উপজেলার চর শৌলমারীর আরেক পাটচাষি বলেন, “নৌকায় করে যাত্রাপুরে নিয়ে যেতে পাটের কামলা খরচ, নৌকা ভাড়া—সব হিসাব করলে লাভ তেমন থাকে না। সরকারও পাটের দাম বাড়ায় না। ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করে এখানকার লোকজন দিনের বেলায় বাড়িতে এসে পাট দেখে। ভালো পাটগুলো আলাদা করে মেপে দাম দিয়ে যায়। রাতে তারাই নৌকায় পাট তুলে নিয়ে যায়।”

কৃষক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জেলার অন্যতম বড় পাটের হাট যাত্রাপুরে মৌসুমে সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার হাটের দিনে চার-পাঁচ হাজার মণ পাট বেচাকেনা হয়। তবে প্রায় এক মাস ধরে হাটে পাটের বেচাকেনা অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।

পাট ব্যবসায়ী মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, “আমাদের দেশ থেকে নৌপথে যেভাবে ভারতে পাট পাচার হচ্ছে, এতে আমরা সাধারণ ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। অন্যদিকে, ভারতে পাচার হওয়ায় বাংলাদেশ রাজস্ব থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।”

আরেক ব্যবসায়ী মো. শাহানুর ইসলাম বলেন, “আমাদের সোনালি আঁশ অন্য দেশে পাচার হবে—এটা মেনে নেওয়ার মতো নয়। ভারত চাইলে বৈধভাবে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে পাট কিনতে পারে। কিন্তু রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে এমন কাজ শোভনীয় নয়। আমরা শুরুর দিকে বিজিবিকে বিষয়টি জানালেও তারা কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।”

স্থানীয়দের অভিযোগ, নদীপথে রাতের বেলায় পাট পরিবহনের ঘটনা ঘটলেও প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি নেই। নৌ পুলিশের টহল না থাকায় পাচারকারী চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বলেও দাবি তাদের।

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম পাট অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত মুখ্য পরিদর্শক এটিএম খায়রুল হক বলেন, “আমরা কয়েকজনের নাম পেয়েছি, কিন্তু তারা স্বীকার করে না। আমার জনবল নেই, আমি একাই কী করব?”

জানতে চাইলে কুড়িগ্রাম ২২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের সহকারী পরিচালক মো. মতিউর রহমান বলেন, “আমরা এ রকমটা লোকমুখে শুনেছি। শোনার পর থেকে গত সাত দিন ধরে টহল আরও বাড়িয়েছি। কিন্তু আমরা কাউকে পাট পাচার করতে দেখছি না। আপনার (সাংবাদিক) কাছে পাচারের সময় তথ্য থাকলে জানাইয়েন, আমরা অ্যাকশনে যাব।”

এই বাংলা/এমএস

এই সম্পর্কিত আরো খবর