বরিশাল মহানগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন, পরিবেশের উন্নয়ন ও নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনে ৭৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩০টি খাল ও ১০টি পুকুর পুনঃখনন ও সংস্কার, ১৯টি ঘাটলা নির্মাণ এবং ৫৭ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হবে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ‘বরিশাল সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন খালের পাড় সংরক্ষণসহ পুনরুদ্ধার ও পুনঃখনন প্রকল্প’ অনুমোদন দেওয়া হয়।
প্রকল্পের মোট ব্যয়ের ৯০ শতাংশ সরকার বহন করবে। বাকি ১০ শতাংশ অর্থাৎ ৭৩ কোটি টাকা বরিশাল সিটি করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে দেওয়া হবে।
দীর্ঘদিন ধরে বরিশাল নগরীর অন্যতম প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, খাল দখল ও ভরাট এবং পুকুরগুলোর পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়েছে। নতুন প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যার সমাধানের পাশাপাশি নগরীর পরিবেশ ও সৌন্দর্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
৩০ খাল ঘিরে ফিরবে প্রাণ, হবে ওয়াকওয়ে
প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩০টি খাল পুনঃখনন ও সংস্কারের পাশাপাশি খালের দুই পাড় সংরক্ষণ, সৌন্দর্যবর্ধন এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ পুনরুদ্ধার করা হবে। এর মধ্যে ১০টি খালের দুই পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ ও আধুনিক আলোকসজ্জার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া কীর্তনখোলা নদীর সঙ্গে খালগুলোর সংযোগ ও জোয়ার-ভাটার পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। এর ফলে খালগুলোর পানি চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পাশাপাশি নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংস্কার হবে ১০ পুকুর, নির্মাণ ১৯ ঘাটলা
নগরীর ১০টি পুকুর ও লেক পুনঃখনন, পাড় সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং আলোকসজ্জার মাধ্যমে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হবে। এসব স্থানে প্রচলিত বৈদ্যুতিক বাতির পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতি স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় সংস্কারের জন্য সম্ভাব্য পুকুরের তালিকায় রয়েছে নবগ্রাম রোডের চৌমাথা লেক, গোল পুকুর, ত্রিশ গোডাউন-সংলগ্ন বধ্যভূমির পুকুর, গড়িয়ার পাড়ের ত্রিকোণ পুকুর ও আমানতগঞ্জ পুকুরসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি জলাশয়।
পাশাপাশি পুকুরগুলোকে জনসাধারণের ব্যবহার উপযোগী করতে বাংলার ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ১৯টি নান্দনিক ঘাটলা নির্মাণ করা হবে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী মো. হুমায়ুন কবির জানান, গুরুত্বপূর্ণ পুকুরগুলোতে এসব ঘাটলা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নির্মাণ ও সংস্কার হবে ৫৭ কিলোমিটার ড্রেন
জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন। এ জন্য নগরীতে ৫৭ কিলোমিটার ড্রেন নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ করা হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান ড্রেনগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, খাল পুনরুদ্ধার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে নগরীর পানি নিষ্কাশন পরিস্থিতির উন্নতি হবে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা কমাতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আগেও নেওয়া হয়েছে বড় উন্নয়ন প্রকল্প
২০০২ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠার পর ২০০৫-০৬ অর্থবছরে নগরীর অবকাঠামোগত উন্নয়নে ২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৩ সালের নভেম্বরে ৭৮০ কোটি টাকার আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় নতুন ৭৩০ কোটি টাকার প্রকল্পটি বরিশাল মহানগরীর অবকাঠামো ও পরিবেশ উন্নয়নে আরেকটি বড় উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
প্রকল্প অনুমোদনে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা নগর প্রশাসকের
প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বরিশাল সিটি করপোরেশনের নগর প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন।
তিনি বলেন, বরিশাল মহানগরীর উন্নয়নে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তারা কৃতজ্ঞ। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বরিশালকে নিজের জেলা হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁর উত্তরসূরি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে আন্তরিক ছিলেন। তাঁর সময়ে বরিশাল বিভাগ, সিটি করপোরেশন ও বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছিল।
বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও বরিশালের উন্নয়নে আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নগরবাসীর জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কাজ শেষ হওয়ার পর প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনে প্রধানমন্ত্রীকে বরিশালে আমন্ত্রণ জানানোর আগ্রহ রয়েছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে বরিশাল মহানগরীসহ পুরো দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নে আরও অগ্রগতি হবে।